Saturday, June 18, 2022

প্রিয় শৈশব

প্রিয় শৈশব,

তুমি ভালো থেকো । তোমার আধিপত্য যখন আমার জীবন জুড়ে; আমি তোমাকে বুঝিনি, তুমি আমাকে ক্ষমা ক'রো ।


বিধি-নিষেধের বেড়াজালে হাঁপিয়ে ওঠা আমি কত-শত শাপ-শাপান্ত করেছি তোমাকে, মুহূর্তে সহস্রবার তোমাকে অতীত করতে চেয়েছি ।

অথচ সেই তুমিই ছিলে সকল বাঁধা এক লহমায় ডিঙোনোর আমার একমাত্র শক্তি ।

জীবনের পথে আনকোরা পথচারী আমি সেদিন উপলদ্ধি করতে পারিনি তোমার অদম্য সামর্থ্য, অপচিত হয়েছো তুমি আমার হেলা-ফেলায় । 


আজ হয়ত বিধি-নিষেধের শৃঙ্খলে আমি বন্দি নই, কিন্তু সেই "বিধি-নিষেধ" আজ আমার জীবনে এসেছে "নীতি-নিয়ম-নৈতিকতা" হয়ে । আজ আর তুমি নেই, বাঁধা ডিঙ্গোনোর অদম্য সাহসও আমার নেই; তাই আজ আমাকে অবদমিত হতে হয়েছে, আজ আমিই হয়েছি অসার-অলীক সেইসব নীতি-নৈতিকতার একান্ত অনুগত একজন । 


প্রিয় শৈশব; 

আমার জীবনকে তুমি আধিদৈবিক সব ক্ষণে পরিপূর্ণ করে তুলেছিলে, প্রণয়াবেগের প্রথম ক্ষণের শ্রেষ্ঠ অনুভূতিতে হৃষ্ট করেছিলে আমার হৃদয়াকাশ, তোমার হৃষিত প্রশ্রয়ে দুরন্ত হয়ে ওঠা আমি পদদলিত করেছি সবুজ মাঠ-পড়ন্ত বিকেল-নীলাকাশ-কাশফুল-নদীর তীর-ছেড়াপালের নৌকো-বর্ষার বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, আরো আরও কতো কি !

কি সখ্যতাই না গড়ে দিয়েছিলে তাদের সাথে তুমি আমার !


আজ তুমি সত্যিই অতীত হয়েছো আমার জীবনে, সাথে নিয়ে গেছো আমার জীবনে তোমার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহারগুলো ।


তবুও তুমি ভালো থেকো ।

ভালো থেকো,

প্রিয় শৈশব আমার ।


নিজ সন্তানের দায়িত্ব নিজ মাতার উপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক ?

আমার সামনের সিটে বসা আপুটি সম্ভবত সদ্য কোনো চাকুরিতে নিয়োগ পেয়েছেন, পোস্টিং চট্টগ্রামের বাহিরে কোনো এক গ্রামে বা মফস্বলে। 

নিশ্চয় সরকারি চাকুরি, না হলে অমন সাধ করে কে'ই বা গ্রামগঞ্জে যেতে চান ! 

তারই পাশে আরেকজন আপু, তারা দু'জন সম্ভবত বান্ধুবী সম্পর্কীয়। তাদের অতি উচ্চস্বরের আলাপন অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করার দরুন আমি অত্যন্ত অনাবশ্যকবশত তাদের আলাচারিতা শুনতে পাই এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হই। 

" তোর পোস্টিং তো *** জায়গায়, ওখানে তোর মেয়েকে নিয়ে যাবি কিভাবে?  ভালো স্কুলও নাই ! "

" নিবো নাতো ** কে  ! "

'' তাহলে ? " (অবাক হয়ে বান্ধুবি প্রশ্ন করলো) 

'' আম্মার কাছে থাকবে! '' (যেনো অতি সাধারণ একটা ব্যাপার) 

(এবার বান্ধুবিটি অতি আস্ফালনের সাথে নিজের কষ্টের ঝুলি মেলে বলা শুরু করলেন)

" তোর আম্মাতো অনেক ভালো, আমার আম্মাতো কোনোরকম বিয়ে দিয়েই শেষ, নিজে এখন ঘুরে বেড়ায়, কিছুদিন বড় ভাইয়ের কাছে আমেরিকা যায়, আবার দেশে এসে ছোটো ভাইয়ের সাথে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায় বড় ভাইয়ের কাছে। "

এতটুকু শোনার পর আমি নিজেই উপযাচক হয়ে সিট পাল্টে দূরে গিয়ে বসলাম, কেনো যেনো তাদের এই আলাপন আর শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। 

প্রসঙ্গত; আমাদের দেশের নারীরা এখন শিক্ষিত হচ্ছেন, ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার- উকিল - পুলিশ - ম্যাজিস্ট্রেট - সাংবাদিক - পাইলট - ব্যাংকার; এমন সব সম্মানজনক পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছেন, অর্থ উপার্জন করছেন। 

বেশ ভালো। 

কিন্তু নিজের মা'কে তাঁর সত্যিকারের 'দেয়টুকুন' দিতে পারছেন তো ? 

সেই মা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি নিজে শিক্ষিত হতে পারেননি বলে নানান গঞ্জনার শিকার হয়েছেন বিধায় নিজের মেয়েকে মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানটুকু আদায় করে দেওয়ার জন্যে নিজের কিশোরীবেলা-তরুণীকালের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন। 

এদেশে একটা ছেলে যখন ডাক্তার হয়, ব্যাংকার হয়, বড় চাকুরে হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই 'ছেলের' মায়ের চাকুরিজীবী ছেলের সন্তানদের নিয়ে অতো ভাবতে হয় না !  

বরঞ্চ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বেশ আরাম আয়েশেই জীবন পার করে দেন।

কিন্তু একজন নারী যখন ব্যস্ত কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ 'সেক্রিফাইস'টি করতে হয় 'মেয়ের মা'কেই । 

পৌঢ়কালেও তাঁকে নাতি-নাতনীদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয়। 

আর এখানেই সমাজে 'ছেলের মা' আর 'মেয়ের মা' এর মধ্যে বিস্তর তফাৎ লক্ষ্য করা যায় । 

আমাদের কাছে মা মানেই যেনো নিজের 'পিতার কেনা আজীবনের ভোগের সম্পত্তি', শুনতে কটু হলেও ক্ষেত্রবিশেষে এটাই সত্য। সন্তানের জন্যে আমৃত্যু নিজেকে বিসর্জন করে যাওয়াই যেনো মানুষটার জীবতকালের একমাত্র লক্ষ্য !  আকারে-প্রকারে-অবস্থায় সময়ের সাথে সাথে ছেলে-মেয়ে উভয়েই আমরা পাল্টালেও ভাবনার জায়গায়টায় কোথায় যেনো বুনোই থেকে গেলাম !

তা না হলে, সেই দুজন আপুর একজনের কথা ধরেই যদি বলি; নিজ মায়ের স্বাধীন-সুখী জীবন নিয়ে তিনি এতটাই অসন্তুষ্ট যে তার মা কেনো তার বান্ধুবির মায়ের মতন নিজের জীবনের শেষসময়টুকুও মেয়ের সন্তানদের জন্যে উদ্বাসন করছে না, সেই আস্ফালনে আপুটি মুখিয়ে উঠেছেন !  

তাহলে সমাধানটা কি ?

সমাধান খুবই সহজ। 

একজন চাকুরিজীবী নারীর সন্তানের প্রতি সেই নারীর মায়ের যে পরিমাণ দায়িত্ব, তার চাইতেও দ্বিগুণ দায়িত্ব বর্তায় সেই নারীর শ্বাশুড়ির উপর। কেননা, আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার দরুণ একজন পেশাজীবি নারীর আয়ের বেশিরভাগংশই ভোগ করেন তার স্বামী ও স্বামীর পরিবার (ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হতে পারে)।

এছাড়াও সন্তানেরা যেহেতু পিতার পারিবারিক পরিচয়েই বেড়ে ওঠে এবং সে পরিচয়কেই ধারণ করে, সে মোতাবেকও সন্তানের প্রতি সন্তানের পিতার পরিবারের দায়িত্বই বেশি বলা চলে। তবে সেক্ষেত্রেও ছেলের মা কিংবা পরিবার দায়িত্ব নিতে কতটুকু উৎসুক, সেটিও দেখবার বিষয়। 

তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সেই কর্মজীবী নারী এবং তার স্বামীর। বিয়ের আগেই তাদের উচিত সন্তানের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ও সমীচীন সিদ্ধান্ত নেওয়া।

'মেয়ের মা' বয়োজ্যেষ্ঠ বা অসুস্থ হয়েও নিজে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিতে চাইলেও তাঁর কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এদিকে,  তিনি সুস্থ-সবল-সামর্থ্যবান হয়েও যদি মেয়ের সন্তানদের দায়িত্ব নিতে না চান তবে তাঁকে 'চক্ষু লজ্জায় ফেলে', 'ইমোশন্যাল ব্লেকমেল' করে তাঁর কাঁধে এমন কর্তব্যবন্ধন আরোপ করাও অনুচিত।


তাই একজন কর্মজীবী নারীর মা'এর উপরই সবসময় সেই নারীর সন্তানদের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি দায়িত্ব দিতেই হয় তবে তার সাথে সেই নারীর আয়ের বেশিরভাগ অংশও দিতে হবে 'মেয়ের মা'কে'ই । আর এ ব্যাপারে একজন কর্মজীবী নারীর স্বামীকেও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী হতে হবে। 


পুণশ্চঃ ; ভাইয়ারা এবং ভাইয়াদের পরিবার, আপনারা একজন নারীকে 'চাকুরি করতে দিয়ে' মোটেও মহৎ কোনো কাজ করে ফেলছেন না। নিজের পছন্দমতন জীবন বেছে নেয়া মানুষ হিসেবে একজন নারীর জন্মগত অধিকার। 

তাই 'গাছেরও খাবেন, তলারও কুঁড়োবেন' সেই পুরাতন ধ্যানধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে নিজের বিবেককে জাগিয়ে তুলে তবেই সিদ্ধান্ত নিন ।।

সত্যিকারের বাবা

বৃষ্টি নেই কিন্তু দমকা বাতাসে বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থা !  আমি দাঁড়িয়ে আছি চৌরাস্তার মোড়ে, আশেপাশে আশ্রয় নেবার মতন দোকান কিংবা 'অভিভাবক শ্রেণির গাছ' কিছুই নেই ! 

শুধু আছেন এক ষাটোর্ধ্ব রিক্সাচালক চাচাজান আর তাঁর রিক্সা। চাচাজান বারবার অনুরোধ করছেন, 'রিক্সায় চাপেন আম্মা, আপনারে বাসের ধারে দিয়া আসি'। 

আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিলো, এরকম একটা আবহওয়ায় এই বয়সী একজন মানুষকে এভাবে কষ্ট দিবো !  অগত্যা আর কোনো উপায় না দেখে আর চাচার অত্যন্ত স্নেহমিশ্রিত অনুরোধের কাছে হার মেনে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলাম। 

এদিকে; কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা আবেগবশত হয়ে চাচাকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, 'আপনার ছেলে মেয়ে নাই ?  এই বয়সে এত কষ্ট করে রিক্সা চালান ?' 

চাচা উত্তরহীন, নিশ্চুপ।

আমি একটু থেমে আবারও শুধালাম, 'আপনার ছেলেমেয়েরা দেখেনা আপনারে?' 

চাচা এবারও উত্তরহীন। তাই আমিও চুপ হয়ে গেলাম, মনে মনে খারাপ লাগছিলো, এই ভেবে যে; মানুষটার স্নেহের সুযোগ নিয়ে অনধিকারচর্চা করে বসলাম।

বেশকিছুক্ষণ পরে, যখন আবহওয়া কিছুটা অনুকূলে এলো, চাচা নিজ থেকেই কথা বলা শুরু করলেন।

যার সারসংক্ষেপ এমন, যৌবনে তিনি বিয়ের পর বিয়ে করে গেছেন, পরকীয়াও করেছেন। এদিকে প্রথম বউ, দ্বিতীয় বউ; এমনকি শেষ বউটার সন্তানের দায়িত্বও তিনি নেন নাই (বউয়ের সন্তান, নিজের নয় কিন্তু)। এদিকে যাদের সাথে পরকীয়া করেছেন তাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ামাত্র তিনি কেটে পরেছেন, পরে আর খোঁজ নেন নাই। 

টাকা উপার্জন করে জুয়া খেলেছেন, বিড়ি টেনেছেন; মোদ্দাকথা জীবনকে 'উপভোগ' করেছেন। আর তার সেই কু-কৃতকর্মের (তার ভাষায়) কুফল তাকে এই বয়সে এসে ভোগাচ্ছে। 

তার তিন স্ত্রীর ঘরে মোট ক'জন সন্তান তিনি জন্ম দিয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট হিসেবও তার নেই ! তবে প্রথম স্ত্রীর বড় দুই ছেলে সন্তান নাকি তার নেউটা ছিলো ভীষণ। বাবা বাবা করে তার জন্যে পাগল হয়ে থাকতো ! তিনিই তাদের উপেক্ষা করেছেন, অবহেলা করেছেন।

ঘটনা শেষে তিনি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

আজ তার অপরাধবোধ হয় ভীষণ ! যদি যৌবনে জীবনের লাগাম টেনে ধরতেন তাহলে এই বয়সে এসে তিনি নিশ্চয় একটা সম্মানের জীবন পেতেন।

চাচার কপোল বেয়ে অশ্রু ঝরে। 

আশ্চর্যান্বিত আমি ভাবি, জীবন তাকে ভুগিয়েছে বলেই আজ তার মাঝে বোধ জেগেছে। সবার মাঝে শেষ জীবনে হলেও সত্যিই কি এমন বোধ জাগে ? 


এ সমাজে একজন নারী যখন 'মা' হোউন; তা তিনি ষোড়শী-তরুণী-যুবতী-ধনী-গরীব যাই হোউন না কেনো, নিজের সাধ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সমাজ তাকে দেবীরূপে মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত করে। আর একজন পুরুষ যখন পিতা হোউন তিনি পিতা কম পুরুষই থাকেন বেশি, আর সমাজের কাছে তাই'ই সই ! 

আর এজন্যই সম্ভবত এই সমাজের লক্ষাধিক সন্তান নিজের পিতার কাছে নিজেরই মা'কে দিনের পর দিন অপদস্ত-অবহেলিত হতে দেখে, এমনকি কেউ কেউ মার খেতে দেখেও অন্ধভাবে নিজের পিতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে ! 


এদেশের 'বাবা'রা সত্যিকারের বাবা হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা শুধুমাত্র নিজের সন্তানের চোখে 'ভালো বাবা' হওয়ার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা 'শরীর সর্বস্ব পুরুষ' না হয়ে সত্যভানে একজন আন্তরিক বাবা হয়ে উঠুন। 

ভালোবাসি তোমায়

আমি পদ্মলতা

তীরন্দাজ,

তুমি কি ছোবে আমায় ?


আমি যে এক উদাসীন কবির কবিতা,

আমার সঙ্গে কভু হয়নি কারো সমঝোতা

হয়নি কারো মিত্রতা,

  

     আমি পাষণ্ড

     আমি বিভাচারী


সবার সঙ্গে হয়েছে যে মোর আড়ি,

নিঃস্ব এ জীবন অভিসম্পাত করে আমায়,


তাইতো ভয় হয় বলতে ;

     ভালোবাসি তোমায় ।


আমি নারী ;

রহস্যময়ী

কখনো আমি কোমল

কখনোবা মৌন,

পাহাড়ের ন্যায় 


তবুও হৃদয় আমার মমতাময়ী,

আমি জানি ভালোবাসতে,

ভালোবেসে সর্বস্ব উজাড় করে দিতে ;


তবুও কি ছোবে আমায় ?

        হে তীরন্দাজ

        অবুঝ আমি 

        ভালোবাসি তোমায় ।


মন আজ বিষন্ন,

ডুকরে কেঁদে ওঠে হৃদয়

দু'চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে,


শূন্যতা; শুধুই শূন্যতা

আজ মনের আকাশে,


হৃদয়ে চাপা কষ্ট কিংবা অভিমান,

ভুলে যেতে ইচ্ছে করে সব অপমান,


এর নামই কি ভালোবাসা !


এ যে কেবলই মরিচীকা আর মিথ্যে আশা ।।


১৩ মাঘ ১8১৭  (২০১০)

অতিপ্রাকৃত কথন

মৃত্যুর পর যে মানুষ বেঁচে ওঠেন না, তিনি আসলে কখনো বেঁচেই ছিলেন না !  

মৃত্যুর পরই সম্ভবত একজন মানুষের সত্যিকারের জীবন শুরু হয়; পরকাল নয়, পার্থিব জীবনই। খানিকটা বাতুল শোনালেও সম্ভবত এটিই অমেয় সত্য। সদ্য দেহান্তরিত মানুষটিকে নতুনভাবে চেনা যায়, এমনকি 'নতুন' তাকে খুঁজে পান তার কাছের মানুষেরাও ! 

একজন ব্যক্তি যদি তার জীবদ্দশায় খারাপ কর্ম করে বেড়ান, তা সে তিনি তার ক্ষমতাবলে তার কুকীর্তিসমূহ যতই গোপন করুন না কেনো, দেহত্যাগান্তর তার কৃত সে সকল অশিব কর্মের কথা প্রকাশ পাবেই এবং তা পরিবর্তনের কোনো সুযোগও তার থাকবে না। 

অনন্ত নিদ্রাযাপনের মুহূর্ত থেকে পরিচিত-অপরিচিত-স্বল্পপরিচিত-ঘনিষ্ট সকল লোকের স্মৃতিতে আজীবন তিনি অপকৃষ্ট ব্যক্তি হয়েই বেঁচে থাকবেন। 

অন্যদিকে, ব্যক্তি গোপনে ভালো কাজ করলেও ব্যক্তির অন্তর্ধানান্তর তা ঠিক প্রকাশ পাবে। এবং সেটিই হবে সেই মানুষটির শেষ পরিচয়।  আত্মিকভাবে পার্থিব জীবনে লোকের স্মৃতিতে তিনি চিরন্তন বেঁচে থাকবেন প্রেয় এবং প্রিয় ব্যক্তি হয়ে। 


সত্যিকারার্থে; মানুষ দেহে বাঁচে না, মানুষ বাঁচে আত্মায়। 

একজন মানুষ দেহত্যাগের পর সেই মানুষটির পরিচিত এবং তার জীবনের সাথে যুক্ত মানুষগুলো তাকে কিভাবে স্মরণ করছেন, তাকে নিয়ে ঠিক কেমন স্মৃতি রোমন্থন করছেন, লোকের স্মরণে পার্থিব জীবনে

আত্মিকভাবে আজীবন তিনি কিভাবে বেঁচে রইবেন; 

তার মাঝেই সম্ভবত একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত থাকে  ।।

প্রণয়ের দহন

প্রজ্জ্বলিত শিখা হয়ে

তুমি জ্বলছো আমার হৃদয়জুড়ে;


আমি একটা মোমবাতির মতন দিনকে দিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে গলে পড়ছি আর মিলিয়ে যাচ্ছি,

আমারই অতলে,

আমার গলে পড়া শরীর থেকে একদিন তৈরি হবে নতুন কেউ,

সেও হয়ত এমনি করে মিলিয়ে যাবে একদিন।

 

ভালোবাসার এমোনি দহন, 

যা আলো করে চারিপাশ,

শুধু দাহন করে প্রনয়িনীর হৃদয়  ।।

নারীদের জন্যে কেনো নেই নিরাপদ-স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামাগার ও প্রার্থনালয় ?

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে সদ্য পরিচিতা সহযাত্রীর সাথে মুখর আড্ডার এক পর্যায়ে আপু হঠাৎই ভীষণ কাশতে লাগলেন, সম্ভবত অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলার কারণে গলা শুকিয়ে কাশি হচ্ছিলো আপুর। 

আমি পানি এগিয়ে দিলাম,

আপু কাশতে কাশতেই নিজের হাতটি দিয়ে আলতো ঠেলে আমার পানির বোতলটি ফিরিয়ে দিলেন ! 


বহু কষ্টে কাশি থামিয়ে খুব ধীরে ঢোক গিলতে গিলতে আপু বললেন, "পিরিয়ড চলছে, পানি খাবো না, এমনিতেই ট্রেনের ওয়াশরুমের অবস্থা খারাপ, আর এই অবস্থায় এসব টয়লেট এ যাওয়ার কথাতো ভাবতেই পারি না" ! 


সত্যিই তাই নয় কি ? 

এদেশে "পাবলিক টয়লেট" রীতিমতো একটি আতঙ্কের নাম। নারীদের জন্যেতো রীতিমতো যমদূতসম ! 

তবে, তা সে যত নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর; যাই হোক না কেনো, পুরুষদের জন্যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাবলিক টয়লেটের দেখা মিললেও, এদেশে নারীদের জন্যে পথে-ঘাটে পর্যাপ্ত শৌচাগারের সুব্যবস্থা আছে কি ? 


শুধু তাই নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ার দরুণ এদেশে কিলোমিটার অন্তর অন্তত একটি মসজিদের দেখা মেলে এবং সেখানে পুরুষদের শৌচ কার্য, হাতমুখ ধোয়াসহ বিশ্রাম নেয়া ও ইবাদতের সুব্যবস্থা থাকলেও, নারীদের জন্যে তেমন কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে। 


অথচ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)- ২০১৯  সালের তথ্য অনুযায়ী; বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩৮ শতাংশ, এছাড়াও বিভিন্ন কারণে দেশের বেশিরভাগ নারীদেরই এখন দেশের নানান প্রান্তে ভ্রমণ করার প্রয়োজন হচ্ছে। 

এমনকি অনেকেরই যেকোনো প্রয়োজনে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার পরে সে শহরে আধঘন্টা অবস্থান করার স্থানটুকুও নেই !  

আবার এমন অনেক নারী আছেন, যারা সদ্য মা হয়েছেন, জীবন জীবিকার প্রয়োজনে দুধের শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে, শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হচ্ছে। এদেশে চলার পথে সন্তানকে দুগ্ধদানের নিরাপদ স্থানটুকু খুঁজে পেতেও তাদের রীতিমতো বেগ পেতে হয়। এ সকল প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় অনেক নারীই হয়ত জীবন জীবিকার পথে এগিয়ে যেতে পারেন না।

তাই নারীদের জন্যে যদি চলার পথে বিশ্রামাগারের সুবিধা থাকতো তবে সেখানে নারীরা প্রাতঃকৃত্যসহ বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পেতেন, একইসাথে নির্দিষ্ট সময়ানুযায়ী ইবাদত-প্রার্থনাও করতে পারতেন। 


ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অনেকেই সমাজে পুরুষ ও নারীর "সমঅধিকার" দাবী করেন, অথচ দৈনন্দিন চলার পথে এতটুকুন "স্বস্তি" পাওয়া থেকে যে প্রতিমুহূর্তে নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, এ নিয়ে কখনই সমঅধিকার সচেতন ব্যক্তিবর্গকে আপত্তি তুলতে বা দাবী জানাতে দেখি নি !


এদেশে নারীদের জন্যেও প্রতিকিলোমিটার অন্তর নিরাপদ-স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামাগার ও প্রার্থনালয় (যেখানে সকল ধর্মের নারীরা একই সুবিধা পাবেন) এর ব্যবস্থা করা হোউক ।

কবিতা

ভারি ভালো লাগে পাহাড়;


বাড়ি আমার সমুদ্রের কাছাকাছি

তাই ছেলেবেলা থেকে তার পাশেই আছি।


কিন্তু কখনো প্রেম হয়নি তার সাথে,


পাহাড়; দেখিনি তাকে কখনও

অথচ তাকে ভেবে ভেবেই আমার সারাটিদিন কাটে । 


একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম ছাড়ব সমুদ্দুর 

যাবো বহুদূর,

যেখানে সূর্য ঢলে পরে পাহাড়ের কোলে

আবার উদিত হয় সেই পাহাড়ের আড়াল থেকেই ।


যাওয়ার বন্দোবস্ত সব পাকাপাকি

শুধু আকাঙ্ক্ষিত দিনটির আসা বাকি।


অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে

আসল সেই দিন ।।


দু'চোখে আমার প্রেমের ঘোর,

সময় তখন খুব ভোর ।


যাত্রা হলো শুরু

বুক আমার উত্তেজনায় দুরু দুরু ।

জয় হচ্ছে আমার প্রেমের

হৃদয়ে বাজে বাঁশি শ্যামের ।


বেশ কিছুদিন কাটল আমার পাহাড়ে

মনে মানে না,

অশ্রু ঝরে লোক চক্ষুর আড়ালে ।


হৃদয়ে অনুভূত হয় হাহাকার

মন বুঝে না,

জীবনে কি যেন কি আছে বাকি পাওয়ার !


সমুখে মেলি দু'চোখ

যেখানে বিশাল আকাশ আর বিস্তৃত মাঠ

চুকে গেছে আমার প্রেমের পাঠ।


ঘোর লাগা চোখ সত্যের সন্ধান করে

মন বলে উঠে,

ভালোবাসি আমি কারে!


প্রেমের ঘোর কেটে যায় আমার;

বুঝতে পারি,

অন্তরে এতো কিসের হাহাকার।


ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই সমুদ্রের পাড়ে

যারে পর করে এসেছি জীবনের তরে।

হয়ত সেথায় আর যাওয়া হবে না,

সমুদ্রকেও যে আর ভুলে যেতে পারবো না ।


কত-শত অবহেলা তাকে করেছি,

সমুদ্রকে ছেড়ে এসেছি পাহাড়ের কাছাকাছি।

অথচ এই সহজ সত্যটিই বুঝতে পারিনি;


তাকেই ভালোবাসি  ।।


- ৮ ফাল্গুন, ১৪১৭ ।

Thursday, June 16, 2022

তুমি

বর্ষার মেঘে সন্ধ্যে নেমেছিল সেদিন,

মেঘাচ্ছাদিত আমি

আমায় বিসর্জন করেছিলাম 'বৃষ্টি বিন্দু কণায়',

তুমি ডুবেছিলে বৃষ্টিস্নাত মেয়েটির আর্দ্র চুলে, চঞ্চল চরণে, 

ছেলে মানুষী খেলায় আর তার জল-কেলীর মূর্ছনায় !


সেদিন বর্ষণের বারি ধারা ধুয়ে নিয়েছিল তোমার চোখের জল,

কিন্তু আমার হৃদয় দেখেছে তোমার হৃদয়ের রোদন,

বৃষ্টি আড়াল করতে পারে নি,

তোমার হৃদয়জাবেগ-বেদনা-চিত্তের ব্যগ্রতা  ।।

Wednesday, June 15, 2022

মায়ের চিঠি

'তোমাকে' অতিক্রম করে আমি 'আমার আমি'কে যত শতবার আলিঙ্গন করতে চেয়েছি,

ব্যর্থ হয়েছি  ।। 


আমার মাঝেই 'তুমি' বর্তমান, 

সেই তোমার অস্তিত্ব জাগানিয়া দিন থেকে তোমার রূঢ়-রুক্ষ কন্ঠ, প্রগাঢ় ভাবনা, ভাবলেশহীন দৃষ্টি, উদভ্রান্ত ভাবনার দিনগুলো পর্যন্ত, 

আমার মাঝেই 'তুমি' বর্তমান  ! 


পৃথিবীর বুকে চলতে শিখে গেছো, ভালোবাসতে শিখে গেছো;

এখন তুমি আমায় আর তোমার ভাবোনা ঠিকই,

কিন্তু না চাইলেও আমায় হৃদয় তোমায় ভাবে,

তোমার জন্যে আমার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ভাঙ্গে শত কোটিবার, 

চাইলেও আমি তোমায় 'অন্য মানুষ' ভাবতে পারি না  ! 

আমার হাত-পা-মুখ-মাথা আর হৃদয়ের মতন, 

তুমিও যেনো আমার দেহেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

তাই তুমি আমায় কারণ-অকারণে ঘৃণা করলেও, 

আমি তোমায় ভালো না বেসে পারি না ! 

নিজের অঙ্গে পচন ধরলেও, 

দিনশেষে যে তা নিজেরই থাকে ! 


প্রিয় সন্তান;

আমি তোমার কাছে এখন এক অন্য মানুষ,

কিন্তু তুমি আমার জীবনে আজীবনই বর্তমান  ।।

মাত্র ইহাই

বিশালাকার মেঘগুলো? 

দলে দলে ছুটে চলেছে যারা,

হঠাৎ ঘর্ষণে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে মৃত্তিকায়? 

আর বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ? 

স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন; 

একা, ভীষণ একা ! 


এ জীবনে কে একা নয় ? 

এ মহাকালে বিচ্ছিন্ন নয় কে ? 

প্রেম-ভালোবাসা-মায়া-মমতা; 

সবই চোখের ভ্রম বা মনের ভ্রান্ত তৃপ্তি নয় কি ? 


পাশ বালিকে স্বামী নামক প্রেমিক পুরুষ আর নারীটি,

সদ্য রতিক্রিয়া শেষে তৃপ্ত দুটো তণু

তৃপ্ত কি তাদের হৃদয়? 

দুজনেই কি ভাবছে এখন দুজনকে নিয়ে? 

নাকি অন্যকিছু? 

কিংবা অন্য কাউকে ।

সেই অন্য কেউ একজনও কি পূর্ণ করতে পেরেছে তার চিত্তকে ? 

তারাও কি একা নয় ! 


পাঁচ-সাতজন নাড়ি ছেঁড়া ধনের যিনি গর্ভধারিণী,

একজীবনের সবচাইতে নিরত-অনবসরজন,

কর্মশীলা গৃহিণী-ব্যাপৃত দয়িতা যিনি;

জীবন শেষে তিনিও যে ভীষণ একলা হয়ে রন ।


দিনোবসানে-জীবনের প্রান্তে;

সকলেই স্বন্তন্ত্র-সকলেই বিচ্ছিন্ন,

একা, আমরা সকলেই ভীষণ একা ! 


আলোর অভ্যাগমনে যে 

নিজের ছায়ারও অন্তর্ধানিত হয়,

এই জগতে কেই বা কার আর আপন হয়ে রয় ! 

তাই একা, 

আমরা সকলেই যে ভীষণ একা  ।।



ইচ্ছে

মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় না,

আবার, একেবারে হারিয়ে যেতেও ইচ্ছে হয় না । 


মনে হয় যেনো আমি থাকি সবার মাঝেই,

কিন্তু কেউ আমায় না খুঁজুক

কেউ জিজ্ঞেসা না করুন, আমি কেমন আছি। 

আমার মনের কথা, গুমরে থাকা হৃদয় আর্তনাদ, 

গুমোট মনাকাশের ব্যথা কেউ না বুঝুক  ।। 


মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় না পৌঁছুতে কোনো গন্তব্যে 

আবার ইচ্ছে হয় না উদ্দেশ্যহীন পাদচারী হতেও,


ইচ্ছে করে ভাবলেশহীন পদব্রাজক হয়ে

নিজের মনের এ কিনারা থেকে ও কিনারায় ছুটে বেড়াই,

কেউ হুট করে জানতে চেয়ে না বসুক,

''কি এমন ভাবো তুমি ? 

কে এমন তোমায় ভাবায় ?''


মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় না,

মনে হয়, 

এই যে রিক্সা-বাস-রেলগাড়ি আমায় নিয়ে ছুটছে,

ছুটুক না তার যত ইচ্ছে, 

বেলা ফুরিয়ে গেলেও,

আমার যাত্রা ফুরিয়ে না যাক। 


অন্তকালের পদব্রাজক হয়ে,

ভাবলেশহীন আবেগে

আমি ঘুরে বেড়াতে চাই 

নিলীন হয়ে যেতে চাই,

উদ্দেশ্যহীন যাত্রায় ।। 

সৌন্দর্য্য

মনোহর রূপমাধুরী বা সৌন্দর্য্যের প্রতি কেই'না অনুরাগী,

কেউ কেউ আবার একান্ত অনুগামীও ।

যুগ-যুগান্তর আমরা আমাদের মানসিকতায় খুব ভ্রান্ত একটা ধারণা লালন করে চলেছি; আর তা হলো, মানুষ মাত্রেই সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসে !

আসলেই কি তাই ?

যদি সত্যিই মানুষ সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসতো তবে গোলাপ কে তার প্রাণসমেত গাছেই শোভিত হতে দিত,

প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরে ম্লান হয়ে ঝরে পরা অজস্র গোলাপের জন্য সহস্র আঁখি আর্দ্র হত । 


কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বীপরিত ঘটনাটাই ঘটতে দেখা যায়। মানুষ তার খেয়ালী মনের পূর্ণকামে গোলাপকে নিজের হস্তগত করে, একটা সময় পর বর্ণ-গন্ধহীন গোলাপটিকে হেলায় ছুড়ে ফেলে দেয় কোন এক আস্তাকুড়ে। 

যদি সত্যিই ভালোবাসা থেকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হত তবে সৌন্দর্য্যহানিতে সেই ভালোবাসা অবজ্ঞায় পরিণত হত না । 

এখানে সৌন্দর্য্যকে পাওয়ার যে অভিলাষ তা নিছক একটা মোহ ছাড়া আর কিছুই নয় ।


সৌন্দর্য্য থেকে যে বন্ধন তা কেবলই মোহ-বন্ধন,

ভালোবাসার বন্ধন নয়। 

খুব ক্ষণস্থায়ী আবেগ থেকেই মোহের জন্ম হয়, যেকোন সময় মন থেকে এরূপ মোহের নিরসন হতে পারে । সৌন্দর্য্যে তেষ্টা আছে কিন্তু তৃপ্তি নেই,তাই মোহাচ্ছন্ন মন বরাবরই বিক্ষিপ্ত ।


প্রায় অধিকাংশ মানব-মানবীর জন্যেই মোহ আর ভালোবাসার পৃথকীকরণ দুরুহ হয়ে পরে । তাই হয়ত বছরান্তে সংখ্যাতীত সম্পর্কের পতন ঘটে,হৃদয়-ক্ষরণে হতাশ হতে হয় অসংখ্য মানব-মানবীকে ।।

জীবন

বালিকাটির ভূগোল পড়তে বেশ লাগত, ভূগোল বইয়ের পাতায় পাতায় চোখ বুলিয়ে সে জগতময় বিচরণ করত ।


ধীরে ধীরে বালিকার মাঝে পৃথিবী ভ্রমণের শখ জাগে, সেই শখ একদিন রূপ নেয় স্বপ্নে ।

স্বপ্নে বিভোর বালিকা প্রায়শই হারিকেনের আলোকে সাহারার সূর্যাস্ত ভেবে ভুল করে, চাঁদের আলোয় সে প্যারিসের পথে হেঁটে বেড়ায়; এভাবে হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্‍ করেই তার কানে একটা সুর বেজে ওঠে, খুব পরিচিত সেই সুর ।

স্বপ্ন বিভোর বালিকার ভ্রম ভাঙ্গে সানাইনের সুরে। তার স্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই তাকে গ্রাস করে অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। 


বালিকার জগত হয়ে উঠে তখন চার-দেয়াল।

প্যারিসের পথে বালিকার আর হাঁটা হয়না। 

উঠোনময় তাকে হাঁটতে হয় সারাবেলা। 

এর-ওর প্রয়োজন মিটিয়ে নিজেকে নিয়ে ভাববার সময়টুকু পর্যন্ত হয়না, আর জগত নিয়ে ভাবনা ? 

সেতো এক বিলাসিতা !


এভাবেই গড়িয়ে চলে দিন-মাস-বছর।

বালিকা বৃদ্ধ হয় । 

একদিন কোন এক পূর্ণিমা রাতে ক্ষীণদৃষ্টিতে সে চাঁদের দিকে তাকায়, তার চোখে ভেসে উঠে শৈশবের সেই ভূগোল বইয়ের পাতা, পাতায় পাতায় আঁকা তার স্বপ্নের জগত, প্যারিসের রাজপথ ।


বৃদ্ধার জোড়া-চোখে জল গড়ায়, আনমনে বেড়িয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস; অতৃপ্ততা আর শুন্যতায় পূর্ণ দীর্ঘশ্বাস ।


জীবন কি কেবলই এক দীর্ঘশ্বাস !

ভালো দিনে ভাবতে হবে অনাগত অনিশ্চিত দিনের কথাও

সময় কখনো থমকে দাঁড়ায় না; 

মানুষ থমকে যায়।


জীবনের গোলকধাঁধায় মুহুর্মুহু বেদনা আর বাঁধায় হাঁপিয়ে ওঠে সে যখন প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে কিংবা জয়ের মাল্য গলায় তার চেতনা ফেরে, 

তখন দেখে সময় বেশ এক ফাঁকি দিয়েছে তাকে। সব হয়েছে,হয়ত কিছুই হয়নি কিন্তু আয়ুষ্কাল ফুরিয়েছে ঠিকই ।।                                    


সময় অতিবাহনের সাথে সাথে পিতা পুত্র হয় আর পুত্র হয়ে ওঠে পিতা; শীর্ণ চারাগাছটি হয়ে ওঠে ঋষ্টপুষ্ট এক কাষ্ঠল বহুল বুড়ো বটগাছ । 

এভাবেই সময় শোধ নেয় প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি; শুধু তাই নয়, তার সাথে সে সকলকে দেয় সমানাধিকারও ।

শ্রেষ্ঠ সময়ের শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে সে সমাধিস্থ করে সর্বোত্তম পতনের সমাধিতে। 

তাই নিজের শ্রেষ্ঠ সময়ে স্বেচ্ছাচারিতার সাগরে গাত্র ভাসিয়ে সময় কে ভুললে চলবে না ।


সময় কিন্তু ঠিক শোধ নেবে !

Tuesday, June 14, 2022

কুক্ষিগত প্রেম

প্রিয় বর্ষা,

আমি চৈত্র, মনে পড়ে কি ?


আমার আকাশে মেঘ ছিলনা,

মেঘমুক্ত আকাশে আমি ছিলাম স্বাধীনতার পরী । 

আমার হাসিতে-কলকল ধ্বণিতে বয়ে যেত সবুজের মাঝে নি:সঙ্গ এক ঝর্ণা ধারা । 

একদিন কোন এক মধ্যাহ্নে আমার সেই হাসির রেশ কোথায় এসে মিলেছে তা খুঁজতে খুঁজতেই তোমার জীবনে আমার আবির্ভাব ।

তারপরতো সবই তোমার জানা ।


আমার মেঘমুক্ত আকাশে তুমি ঘটালে মেঘের ঘনঘটা । 

একদিন যে হাসির টানেই তুমি আমার জীবনে এসেছিলে, তোমার হৃদয়ে আমাকে পেয়েছিলে;

করে দিলে সে হাসি মানা । 


ভয় পেয়েছ বুঝি ? 

যদি অন্য পুরুষও সেই হাসির অনুরণনে মোহিত হয়ে তার হৃদয়ের কোন এক গোপন কোটরে আমায় আবিষ্কার করে বসে,

ঠিক তোমারি মতন ।

হায় ! 

তারপরও তোমার সুখ নেই । 

ওই নিষিদ্ধ জিনিষই তোমার চাই । 

কিন্তু সবার জন্য নিষিদ্ধ করে যা তুমি একান্ত নিজের করে পেতে চেয়েছিলে তা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল! 


এতো রোমান্টিক-প্রকৃতিপ্রেমী তুমি কি করে ভুলে গেলে ! 

প্রকৃতির কোল থেকে ফুলকে ছিনিয়ে নিয়ে কোটায় পুরলে না থাকে তার গন্ধ আর না সৌন্দর্য্য । 

উল্টো সে ফুল মরে হয়ে যায় বিভত্‍স ।


আমিও যে সেই ফুলের মতই অসহায় ।

তোমার কোটায় তাই আজ আমিও বিভত্‍স; 

বড় বেশী বিভত্‍স ।।

সম্পর্ক

সম্পর্কে কেউ কাউকে বোঝেনা ; 

বুঝতে যে চায় না তা নয়, 

হয়ত এই বোঝাবুঝির হিসেবটা খুব সোজাসুজি নয় । 

তাই না বোঝার চূড়ান্ত অনিচ্ছাতেও অনেককেই নিতান্ত অপারগ হতে হয়।       

এক্ষেত্রে অভিযোগ যে করে সে যেমন অভিমানী,

যার প্রতি করা হয় সেও কোনাংশে কম নয় । 

তাই প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী,বাবা-মেয়ে, মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে, মা-ছেলে সর্বোপরি সম্পর্কের প্রতিটি রূপে নিয়োজিত প্রত্যেক বাস্তব রূপকারদের এই একটাই অভিযোগ, 

কেউ কাউকে বুঝছেনা । 

কি এক টানাপোড়ন সম্পর্কগুলোতে ! 

অথচ পারস্পরিক এই বোঝাবুঝির খেলায় কেউ হার মানতে রাজি নয় ।

যে যাকে বোঝাতে চাইছে সে যেমন আন্তরিক নয়, 

তেমন যে বুঝতে চাইছে সেও মনোযোগী নয় ততটা;

না সেই বুঝতে চাওয়া মানুষটির প্রতি না তার নিজের প্রতি ।এভাবেই সম্পর্কের টানাপোড়েনে সম্পাতিত হয় পারস্পরিক সম্বন্ধ। 

সম্পর্ক ভাঙ্গে সম্পর্ক গড়ে । 

প্রেমিক-প্রেমিকারা পুরাতন হাত ছেড়ে চোখের জল মুছে নতুন হাত খোঁজে,

সন্তান প্রচন্ড আক্ষেপ-অভিমানে দন্ত খিঁচিয়ে শিরা-ধমনী ফুলিয়ে বাড়ি ছাড়ে, পিতা পুত্রকে ত্যাগ করেন;

এমন আরো কতো কি ! 

অথচ অবুঝ কিছু মানুষ ঠিকই নিজের সম্পর্ক গুলো বাঁচিয়ে চলেন; হয়ত নিজের অজান্তেই কিংবা প্রকৃতি প্রদত্ত কোন শক্তি বলে  ।।

শেষ চিঠি

শেষ চিঠিটা জীবনের শেষ মানুষটাকে আর দেওয়া হলোনা । 


এই সূত্রের শেষ ফলাফল অনুযায়ী সম্পর্কটাও আর শেষ হলোনা; ভালোবাসাটাও বোধহয় আর ফুরালোনা  ।।                       

এভাবেই চলতে থাকে শেষ না হওয়া সম্পর্কগুলো ; 

মনের কোন এক মণিকোঠায় মানুষটা থেকে যায় । 

কোন ভাবেই তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না । 

খুঁজে পাওয়া গেলে হয়ত তাকে খুব কড়া করে বেরিয়ে যেতে বলা যেত । 

কিন্তু তাকে'তো কেবল অনুভব করা যায়; 

অনুভবের মাঝারে যে অনুভূতি মিলেমিশে একাকার কি করে সে অনুভূতি তাড়ানো সম্ভব ! 

তাই এরকম এক নি:শেষ অনুভূতি নিয়ে জীবনের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হয় । 

একি বেঁচে থাকা ! 

এ যে কেবলই শ্বাস-প্রশ্বাস নিষ্ক্রমণ । 

তাই শেষ মানুষটিকে অনুভব করে জীবনের শেষ পর্যন্ত কোন এক নির্ঘৃণি সত্ত্বার নি:স্বার্থ আলিঙ্গণে নিরন্তর নি:শ্বাস নিতে হয় । 

শেষ পর্যন্ত জীবনের শেষ চিঠিটা 

শেষ মানুষটাকে আর দেওয়া হয়না  ।।

সমাপ্তি

কেমন আছো ? 

এখনো কি তোমার চুলগুলো থাকে আগোছালো, 

এখনো কি তুমি সেই আগের মতই এলোমেলো ? 


একদিন, দু'দিন, এক সপ্তাহ, দু'সপ্তাহ; 

এমনি করে সাতটি বছর কেটে গেল ! 

কতদিন তোমায় দেখিনি, 

এতো চেনা তুমি মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যাবে ; 

কখনো ভাবিনি । 

কি অদ্ভূত সুন্দর ছিল সেইসব দিনগুলো ! 

স্বপ্নগুলো আজও জীবন্ত ,  

 "মেয়ে হলে বন্যা 

আর ছেলে হলে প্রান্ত" । 


থাক সে সব অতীতের কথা 

এবার তোমার কথা বলো, 

কেমন আছো তুমি ? 

শুনেছি এখনো একাই আছো, 

মাঝে মাঝে শুভদার দোকানে আসো, 

তাইত বার বার শুভদার কাছে ছুটে যেতাম; 

তোমার কথা জানতে চাইতাম, 

আর হতাশ হয়ে ফিরে আসতাম । 

যখন আমার জিজ্ঞাসু চোখের প্রত্যুত্তরে শুভদার আনত নয়ন বুঝিয়ে দিত, 

একটিবারও জানতে চাওনি তুমি, 

কেমন আছি আমি ? 


কেন জানতে চাওনি ! 

আমি অন্য পুরুষের বাহুতে নিজেকে সমর্পণ করেছি বলে, 

প্রাচুর্য্যের দেয়ালে ঘেরা বাড়ীতে আমার বসবাস বলে ! 

তবে কি তুমি আমায় ঈর্ষা করো ? 

তোমার মনে কি তবে আজ প্রশ্ন জাগে , 

আমি বড় না তুমি বড় ? 

এই তুমি কি সেই তুমি ? 

আমার এতটুকু ব্যর্থতা এতটুকু কষ্ট যার সইত না , 

থাক এসব কথা; 

তুমি কেমন আছো বলো ? 

আজ আমার সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি আছে, 

যার দরকার ছিল সাতটি বছর আগে । 


সাদা থান গায়ে জড়াবার পরে 

আমি অর্ধ-স্বাধীন, 

বাবা মারা যাবার পর 

আমি মুক্ত বিহঙ্গ, 

নই আর পরাধীন । 


স্বামীর মৃত্যুতে অসহায় হয়েছি বটে, 

তবে সেই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু স্বস্তি দিয়েছে আমাকে । 

বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন বড় ঘর দেখে, 

বিয়ে দিয়েছিলেন অর্থ,খ্যাতি আর প্রতিপত্তির সাথে । 

তার মাঝে চাপা পরা আস্ত এক জানোয়ার, 

দমবন্ধ করা সেইসব দিন গুলোর কথা নাই বা বলি তোমায় আর। 


এখন আমি অনেক ভাল আছি, 

ইচ্ছে মতন তোমায় ভালোবাসি । 

কারো বাহুতে আর অনিচ্ছাকৃত দেহ সমর্পণ করতে হয়না, 

দেহ না পেলে মারে না কোন হায়না । 

শরীর তার কুমারিত্ব হারিয়েছে কিন্তু মনটা সেই আগের মতই আছে। 

সেই তোমারই আছে 

সাতটি বছর আগে যেমন ছিল 

কেউ ছুঁতে পারেনি একবারও । 


অনেক কথা বলা হয়ে গেল, 

তুমি ভাল আছো কিনা বল ? 

এখনো কি তুমি খুব ভোরে 

আমার জন্য শিউলি ফুল কুঁড়াও ? 

এখনো কি তুমি আমার নামে 

মুক্ত আকাশে লাল ঘুড়ি ওড়াও ? 


থাক কিছু বলোনা 

আমি জানতে চাইনা । 

ভয় হয়, যদি উত্তর পাই 

আমার কথা তোমাকে আর ভাবায় না । 


থাক সেসব কথা, 

আর বাড়াবোনা তোমার ব্যথা । 

তুমি ভালো থেকো 

নিজের খেয়াল রেখো । 


মাঝে মাঝে মসজিদের পাশের 

সেই বাঁশঝাড়ে এসো । 

আমার পাশে বসো, 

আমায় একটু ছুঁয়ে দিও, 

তৃষ্ণার্ত আমায় একটু তৃপ্ত করো ; 

আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব । 


তুমি ভালো থেকো । 

ইতি 

তোমার সমাপ্তি ।।

সোহাগ কথন

খুব করে বকে দিও একদিন ; তখন,

কখন ?

ভালোবেসে তোমার কাছে আসবো যখন !


তারপর ?

অভিমান হবে,

বেশতো, 

অভিমানে গাল ফোলাবো ।

তুমি সোহাগে-অনুরাগে মান ভাঙ্গাবে !


তারপর ?

আবারো তোমার সন্নিধানে আসবো,তুমি বকবে,অভিমানী আমি গাল ফোলাবো ; পুনর্বার,বারংবার ।


অনন্তর ?

তুমি মান ভাঙ্গাবে ! 


সেইতো ওই একই হলো ।

বারংবার ভৎর্সনায় ভালো লাগে না,

তারচেয়ে বরং কাছেই এসো না ।


তবে যে আমার তোমায় আর অতিক্রম করা হবে না কোনদিনই,

তোমার অতলান্তে অতিকায় আমার যে হৃদয়ঙ্গম ; তা নিরবধি অধরাই থেকে যাবে ।


তোমার পরশ স্পর্শে অত্যুজ্জ্বল আমি প্রতিনিয়ত পুনর্জীবিত হবোনা,

প্রাণান্ত এই পৃথিবীতে নির্জীব প্রাণিতের ন্যায় কেবল বেঁচে থাকব,কেবলই বেঁচে থাকবো  ।।

প্রণয়ী পূজক

ভালোবাসো ?

হুম, মেঘের মতন ।

বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরবে যে ? 


তাহলে শুকতারা  ?

খসে পরবে ।

আলো 

দিনশেষে মিলিয়ে যাবে ।


আকাশ,অজস্র তারা খচিত নীল আকাশ  ।

সেতো শূন্যতার মাঝে মরিচীকা  !

তবে ? 

তবে আরকি ? পুরোটাই ফাঁকি ।


ভালোবাসি ।

প্রবঞ্চনা ।


ভালোবাসি,ভালোবাসি ঠিক ভালোবাসার মতন করে ;

একেবারেই নিজের মতন করে,

হৃদয়জ নিরত্যয় আবেগে ; 

তোমার প্রণয়ী পূজক হয়ে ।।

Monday, June 13, 2022

কেনো বাবা-মা হিসেবে পারফেকশনিস্ট না হওয়াই ভালো ?


আমি একজন পারফেকশনিস্ট মায়ের সন্তান ।

আমার মা একজন 'পারফেকশনিস্ট', বাংলায় যাকে বলা যায় 'পরিপূর্ণতাবাদী' !
আরও সহজ করে বললে আমাদের বাসায় 'ধূলোও যেনো ঢুকতে ভয় পায়' এমন দশাই বিরাজ করে।
আমার বন্ধু থেকে আত্মীয়পরিজন সকলের কাছেই আমার শৈশব-বেড়ে ওঠা-আমার সদ্য অতীত হওয়া জীবন (বর্তমানে মায়ের সাথে নেই তাই) অত্যন্ত ঈর্ষণীয় !
সেই বুঝ হওয়ার পর থেকে আমার মনে পরে না আমি আমাদের বাসা কখনও অগোছালো দেখেছি কি না। এমনকি ঝড়-ঝাপটা-বিপদ-আপদ, যত যাই কিছুই হোউক না কেনো আমাদের বাসা এক মুহূর্তের জন্যেও নোংরা হয়নি, এতটুকুন অগোছালো হয় নি, কোথাও কিঞ্চিৎ ধুলো জমে নি, কোথাও মরিচা পরে নি, সিংক এ হাড়ি-পাতিল-প্লেট-বাটি জমেনি, আমাদের কারো কাপড় (বাসায় আগত অতিথিসহ) আকাচাতো থাকেইনি বরঞ্চ ইস্ত্রী করা কাপড় যে যার ড্রয়ারে পেয়েছে সবসময়।
এমনকি আমার বাবা যখন অসুস্থাবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন, তখনও আমাদের বাসা এতটুকুন এলোমেলো হয় নি। মা সারারাত সারাদিন বাবার সেবা করার পরও কিছুক্ষণের জন্যে বাসায় এসে বাসা গুছিয়ে দিয়ে যেতেন।
আমার মা এ সকল কাজ একাই করেন ! সাহায্যকারী থাকলেও মা তাদের উপর বিশেষ আস্থা রাখতে পারেন না বিধায় সাহায্যকারীগণ বেশিরভাগ সময়ই নীরব দর্শকের ভূমিকাই বেশি পালন করেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে যথারীতি ব্রেকফাস্ট আর চা পেয়েছি, এমনকি আমার ক্যাম্পাসবেলায় সেই শীতের ভোর ৬ টা নাগাদ যখন বাসা থেকে বের হতে হয়েছে, তখনও ঠিক সাড়ে ৫ টায় ডাইনিং এ নাস্তা সাজানো পেয়েছি ! এর ব্যত্যয় ঘটেনি কখনও।
এমনই ঠিক দেড়টায় লাঞ্চ, বিকেল সাড়ে ৪ টায় নাস্তা আর রাত ঠিক সাড়ে আটটায় ডাইনিং এ তৈরি ডিনার পেয়েছি।
শুধু তাই নয়, আমার পড়ার টেবিলে রাখা পানির ফ্লাস্কটি কখনই আমি ঘোলাটে এবং খালি দেখিনি! ফ্লাস্কটিতে গরমের দিনে শীতল আর শীতের দিনে গরমপানি পূর্ণ পেয়েছি।
একইরকমভাবে শীতের সময়টাতে ছুটির দিনে ঠিক সাড়ে দশটা নাগাদ স্নানকক্ষে গিয়েই গরম পানি পেয়েছি, আর বাসার বাহিরে থাকলে বাসায় আসার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই স্নানের জন্যে স্নানকক্ষে দেখেছি গরম পানি রাখা আছে ।
হুট করে কেউ আমাদের বাসায় গেলে তার মনে হতে পারে এ বাসায় কোনো রূপকথার গল্পের পরী আছেন, যিনি চোখের পলকে নিরলসভাবে সবার চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছেন !
হ্যাঁ আমি একজন পারফেকশনিস্ট মায়ের সন্তান, এবং ঠিক এই কারণে কিছুদিন আগেও অন্য আর সবার মতন আমি নিজে নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবতী ভাবতাম ।
আদতে কি তাই ?
সত্যিই কি পারফেকশনিস্ট মায়েদের সন্তানরা অত্যন্ত 'সৌভাগ্যশালী' ?
আমি সেই বুঝ হবার পর থেকে কেবল 'পেয়েই' এসেছি, 'করেছি' কম ! তাই আমার কাছে 'পাওয়াটা'ই যেনো স্বাভাবিক, 'নিজে কিছু করে নেওয়াটা' খানিকটা অস্বাভাবিক, অস্বস্তিকরও !
এমন একজন মানুষ যখন বাস্তবজীবনে পদার্পণ করেন, তখন তার উপাগত জীবন ও আগামীর দিনগুলো তার নিকট হয়ে ওঠে এক ভীষণদর্শন !
একজন পারফেকশনিস্ট পিতা কিংবা মাতা ভুলে যান; তাঁর সন্তান কেবল তারই সন্তান, পুরো পৃথিবীর সন্তান নয় ! তাই তিনি সেই সন্তানকে যতই তার ডানার ভেতর আগলে রেখে তৈয়ারি জীবনে অভ্যস্ত করুন না কেনো, প্রকৃতির বিধানানুসারে বাস্তবতা একদিন তাকে টেনেহিঁচড়ে পিতা-মাতার বুক থেকে ছিনিয়ে নেবেই। আর সেদিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত না থাকা আর তৈয়ারি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা সেই সন্তান যাপিত জীবনের পথে অনেকটাই পিছিয়ে পরবে, আর একইসাথে জীবনের পথে সে হয়ে উঠবে নিরাধার !
পাখি যদি তার সন্তানটিকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে ফেলে না দিতো, তবে কিন্তু সেই ছানাটি কখনই উড়তে শিখবে না! জীবনভর খঁজই থেকে যাবে ।
তেমনই আমাদের বাবা-মায়েরাও সন্তানদের নিপট জীবনের লড়াইয়ের প্রস্তরে একাকী ছেড়ে দিন, যেনো সে একাই লড়তে শিখে যায়, তার জন্যে করা বাবা-মায়ের অমূল্য ত্যাগকে মূল্যায়ন করতে শেখে। একইসাথে এমনতর অন্ধভাবে ভালো না বাসুন, যেই ভালোবাসা সন্তানকে জীবনের পথে পঙ্গু বানিয়ে দেয় ।
এটি ঠিক অনুযোগ নয়, এটি অবগতি ।।

"আত্মোপলব্ধি"

শহুরে ইটকাঠের জীবনে অভ্যস্ত আমি।

এখানেই আমার জন্ম, আমার বড় হয়ে ওঠা। গ্রামে বেড়াতে গিয়েছি মোটে দু'চারবার। তাও কখনই চব্বিশঘণ্টা জুড়ে থাকা হয়নি আমার। বাবার সাথে সকালে বাড়ি পৌছে গাড়িময় আম-কাঁঠাল-ধান-চাল নিয়ে বিকেলের মধ্যে বাসায় গমন, এই'ই ছিলো আমার গ্রাম ভ্রমণ !
আর ঠিক এই কারণে দেশের নব্বই শতাংশ মানুষের জীবন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না, এ ব্যাপারে আমি ছিলাম এক্কেবারে মূর্খ-অজ্ঞ !
আর ঠিক এরকম এক অজ্ঞতার দরুণ আমি আমার জীবনের সবচাইতে বড় অপরাধটা করেছি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।
নিজ গন্ডি থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই প্রথম নিজের পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ এবং নানান জেলার নানান মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময়টাতে অনেকের অনেককিছুই আমার 'বেঠিক' মনে হত, তার মধ্যে অন্যতম ছিলো 'ভাষা' এবং 'ম্যানার' বা 'আচার-আচরণ-আদব' !
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে এমন একজন মানুষ 'শুদ্ধ উচ্চারণে' কথা বলতে পারছেন না, আদবের সাথে 'খেতে-পড়তে-বসতে' পারছেন না এবং এত এলোমেলো 'বাচনিক, বিশেষত অযাচিত অবাচনিক' যোগাযোগ করছেন, এটা আমি মেনেই নিতে পারতাম না। যার দরুণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের জানা-শোনা-শিক্ষার নিরিখে যে অনুমাপক আমার মানসিকতায় তৈরি হয়েছিলো সে অনুযায়ী তথাকথিত 'স্মার্ট' না হলে আমি বরাবরই এড়িয়ে যেতাম।
সে সময়টাতে আমার একবারও মনে হয় নি, এখানে যারা পড়তে এসছেন তারা কতটা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পড়তে এসছেন। এ অবধি পৌছুতে কত কাঠ-খড়ই না তাদের পোড়াতে হয়েছে! একেকজনের এ পর্যন্ত আসার পেছনে কত শত সংগ্রামের গল্পই না লুকিয়ে আছে !
আমার বাবা গ্রামের ছেলে ছিলেন, তিনিও একদিন এভাবে নিজের ঘর-বাড়ি সব পেছনে ফেলে শহরে পড়তে চলে এসেছেন বলেই আজ আমরা এমন একটা তৈয়ারি জীবন পেয়েছি!
গেলো তিন বছর যাবত দেশের নানান জেলা আর প্রত্যন্ত কিছু গ্রাম ঘুরে দেরিতে হলেও এই উপলব্ধিটা আমার হয়েছে। এবং প্রতি মুহূর্তে আমি অনুতপ্ত হয়েছি এবং অনুভব করেছি নিজের মানসিকতার মানদণ্ডে ফেলে কাউকে আচার-বিচার করাটা একদম ঠিক নয়।
এদেশে এমন কত স্থান আছে; পানি পথ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই, চট্টগ্রাম থেকে চব্বিশ ঘন্টার দুরত্ব কিংবা কিছু জায়গা এতই অনুন্নত যে সামান্য ঝড়েও বেশিরভাগ মানুষ মাথা গোজার ঠাঁই হারায়, বিশুদ্ধ জল পায় না, বিদ্যুৎ নেই; যেখানে সে সব জায়গা থেকে শুধুমাত্র পড়াশুনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার পর্যন্ত আসাটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে 'শুদ্ধ সাবলীল উচ্চারণে কথা বলা, খাবার খাওয়ার ম্যানার, বসার ম্যানার, মেয়েদের সাথে কথা বলার ম্যানার' বিষয়গুলোতো ভীষণ তুচ্ছ !
এইতো গতকালই, রেস্টুরেন্টে বেশ ক'জন মেয়ে পাশের টেবিলে বসা কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে হাসছিলেন। ছেলেগুলো সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী এবং তারা শহরে এসেছেন খুব বেশিদিন হয় নি হয়ত, সম্ভবত প্রথম বা বড়জোর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কথায় স্পষ্ট গ্রাম্যটান, চামচ দিয়ে খাবেন না হাত দিয়েই খেয়ে নেবেন তা নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তা করছিলেন সবাই মিলে, এদিকে আবার চামচ দিয়ে কিছুতেই পাতের মাংসটাকে বাগে আনতে পারছিলেন না। তাদের মুখের ভাষা, খাওয়ার আদব নিয়ে পাশের টেবিলে বসা মেয়েগুলো হেসে লুটিয়ে পরছিলেন। আমি নিশ্চিত তাদের বাবা না হলে দাদা, কিংবা দাদার দাদার অবস্থাও একসময় এমনই ছিলো, কিংবা তার চাইতেও খারাপ। ভাগ্য ভালো বিধায় পিতৃগুণে কিংবা পূর্বপুরুষদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে তারা তাদের জীবনে সেই ছেলেগুলো থেকে কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে গেছেন।
'আমরা এগিয়ে গেছি'; তার মানে এই নয় যে যারা কথায়-চলায়-চিন্তায় একটু 'পিছিয়ে' আছেন, তাদের আমরা হেয় প্রতিপন্ন করবো।
প্রকৃতি কাউকেই আজীবন পিছিয়ে রাখে না, আবার কাউকে আজীবন এগিয়েও রাখে না। যারা আজকে এগিয়ে আছেন, কে জানে! তারাই কয়েক প্রজন্ম পরেই হয়ত আবার পিছিয়ে পরবেন। তাই আমাদের উচিত সকলের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
'ভাষা-আদব-কথা-বলা-চলা' দিয়ে কাউকে আচার বিচার না করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ।।

কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন "দিবাযত্ন কেন্দ্র"


একজন চাকুরিজীবী বিবাহিত নারী যখন জানেন যে তিনি মা হতে চলেছেন, তখন তার সেই বাধভাঙ্গা আনন্দের সাথে যোগ হয় রাজ্যের দুশ্চিন্তা ! আর দুশ্চিন্তা হবেই বা না কেনো!

এদেশে একজন নারী যখন বউ হোন এবং পরবর্তীতে মা হোউন তখন সমাজ-পরিবার মিলেমিশে সেই নারীকে বেধে ফেলে নানান ভ্রান্ত বিধিনিষেধের বেড়াজালে, একইসাথে দিকপাশ না ভেবেই তার গলায় জড়িয়ে দেওয়া হয় দায়িত্ব-কর্তব্যের মালা ! সেক্ষেত্রে মা হতে চলেছেন এমন একজন নারীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে সমাজ এবং পরিবার, কারণ অলিখিতভাবে সমাজ এটি নির্ধারণ করে দিয়েছে যে সন্তানের দায়িত্ব বরাবরই মায়ের উপরই বর্তায়। যেহেতু প্রকৃতির বিধান মতে সন্তান বেড়ে ওঠে মায়ের গর্ভেই এবং সদ্যোজাত সন্তানের একমাত্র খাবার হয় মায়ের বুকের দুধ, তাই সমাজ তার সেই অযৌক্তিক-অন্যায় বিধানটি খুব সহজেই মহাসমারোহে মায়েদের উপর চাপিয়ে দিতে পারে। তাই একজন নারীর মা হওয়ার প্রাথমিকাবস্থার সময়গুলো হয়ে ওঠে তীব্র যন্ত্রণার, কারো কারো ক্ষেত্রে আবার মা হওয়ার পুরো যাত্রাটাই হয়ে ওঠে দুঃসহ বেদনার।
তা সে যা বলছিলাম; একজন চাকুরিজীবী বিবাহিত নারী যখন জানেন যে তিনি মা হতে চলেছেন, তখন তিনি ভাবনায় পরে যান মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে যখন তিনি কর্মস্থলে যোগ দেবেন তখন তার দুধের শিশুটির দেখভাল কে করবে! কার কাছে রেখে যাবেন তিনি তার মাত্র মাস সাতেকের শিশুটিকে! একেবারেই হাতে গোণা ক'জন নারী আছেন যারা এ সময়টাতে পরিবারকে পাশে পান, পরিবারের সমর্থন ও সহায়তা পান। কিন্তু বেশিরভাগ নারীর জন্যেই জীবন হয়ে ওঠে নিরতিশয় সংগ্রাম ও অসহায়ত্বের।
সহায়তা ও সমর্থনের বীপরিতে সমাজ ও পরিবার কর্মজীবী মায়েদের দিকে আঙ্গুল তোলে, নানান কটুকথা আর নতুন মা হওয়া নারীর গায়ে স্বার্থপরের তকমা লাগিয়ে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মজীবী মায়েরা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের উজ্জ্বল পেশাজীবনের ইতি ঘটিয়ে নিজের স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দিয়ে দেন।
কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না! একজন শিক্ষিত পেশাজীবি নারীর 'ক্যারিয়ার'ও তার নিজ সন্তানের মতনই মূল্যবান। বেশিরভাগ নারীই যখন নানান প্রতিকূলতা আর কাঠখড় পুড়িয়ে নিজের শিক্ষাজীবনটি অতিবাহিত করেন, তখনই তিনি নিজের পেশাজীবন নিয়ে স্বপ্ন বোনা শুরু করেন, এবং একসময় অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। এক্ষেত্রে যেই নারীকে তার যুগের পর যুগ যাপন করে বোনা সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়, একমাত্র তিনিই জানেন সেই আঘাতটা ঠিক কেমন ! এই আঘাত সন্তান হারানোর আঘাতের মতনই তীব্র, এই ব্যথা ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ব্যথার মতনই তীক্ষ্ণ! আর যেই মা শতবাধা বিপত্তি, পরিবার-সমাজের রাঙানো চোখ, প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কর্মস্থলে যোগ দেন এবং নিজের ছোট্ট শিশুটিকে পরিবারের বাহিরে গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে নিজের পেশাজীবনকে এগিয়ে নিয়ে যান, সেই মা'ই জানেন হৃদয়ে ঠিক কেমন কাঁচ কাটা ব্যথাটা লাগে, সেই ব্যথা সে মা ছাড়া কখনই কেউ সমানুভূতি দিয়ে অনুভব করতে পারবে না।
কর্মজীবী মায়েদের যেনো কষ্টের শেষ নেই, কর্মজীবী মায়েদের যেনো শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণার শেষ নেই। অথচ রাষ্ট্র চাইলেই কর্মজীবী মায়েদের এমন উভয় সংকটাপন্ন জীবন থেকে নিস্তার দিতে পারে, রাষ্ট্র চাইলেই মায়েদের কষ্ট লাঘব করতে পারে।
কিভাবে ?
প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে বাধ্যতামূলক 'ডে কেয়ার' বা "দিবাযত্ন কেন্দ্র" এর ব্যবস্থা করা হোউক। এক্ষেত্রে কেবল কর্মজীবী মায়েরাই নন, স্বস্তি পাবেন বাবারাও। অনেক সময়ই সন্তানের মায়ের অসুস্থতার কারণে বা পারিবারিক যেকোনো সংকটে সন্তানের সম্পূর্ণ দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয় বাবাকেই। কর্মস্থলের দিবাযত্ন কেন্দ্র স্বাচ্ছন্দ্য দেবে সেই দিশেহারা বাবাকেও।
সন্তানের দায়িত্ব মা-নাকি বাবার সে বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের ভাবতে হবে সমস্যার সমাধান নিয়ে। কেবল মায়েরা নন, সন্তানের দায়িত্ব সমানভাবে সন্তানের বাবারতো অবশ্যই। তাই মা-বাবা দুজনেই যেনো নির্বিঘ্নে নিজের পেশাজীবনে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিশ্চিন্তভাবে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন তাই প্রতিটি দপ্তরে বাধ্যতামূলক 'ডে কেয়ার' বা "দিবাযত্ন কেন্দ্র" স্থাপন করা অত্যাধিক জরুরি। সেটি পরিচালনার জন্যে আলাদা বাজেট থাকতে পারে, কিংবা বাবা-মায়েরা নিজেদের পারিশ্রমিকের একাংশ দিয়েও তা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু প্রারম্ভিক পদক্ষেপটি নিতে হবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই।

বিয়ে

বলছি আমার এক পরিচিত ভদ্রলোকের কথা, ভদ্রলোক হন্যে হয়ে বিয়ের পাত্রী খুঁজছেন ।

ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে সুপাত্র ভদ্রলোকটি সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক ।
ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার, উচ্চশিক্ষিত, পোশাকে- আসাকে ছিমছাম, দেখতে রাজপুত্তুর না হলেও সমাজে ত্রিশোর্ধ্ব মোটা ভুঁড়ির একজন সম্পদশালী সজ্জন !
ভদ্রলোকের বিয়ে করার ভীষণ তাড়া !
স্ত্রীকে মায়ের হাতে সঁপে দিয়ে উচ্চতর ডিগ্রীধারী হওয়ার উদ্দ্যেশে যেতে হবে সুদূর সুইজারল্যান্ড না কোথায় যেনো ।
হাতে সময় নেই একেবারেই !
তাঁর আত্মীয়ার কাছেই জানতে চাইলাম ;
তা ওনার আগের স্ত্রী চলে গেলেন কেনো ! শুনেছি বিয়ে হয়েছে বেশি দিন হয়নি ?
আত্মীয়াঃ আর বলবেন না ! লেখাপড়া করলেই কি আর মানুষ মানুষ হয় ? (উল্লেখ্য, আগের স্ত্রী পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন)
কি করেছিলেন উনি ?
আত্মীয়া: (তার ভাষাতেই) সকালে বের হইতো বিকালে আসতো, যেইদিন সারাদিন বাসায় থাকতো, সেইদিন রাতে চলে যাইতো। আর পরের দিন ফিরে সারাদিন ঘুমায়তো। বাপ মা মানুষ করতে পারে নাই বুঝছেন। শ্বশুড়বাড়ির কারো প্রতি কোনো খেয়াল ছিলো না। বাবুটার (স্বামী ভদ্রলোক) উপরও টান ছিলো না ! নিজেরে নিয়া থাকতো ।
রান্না করতো ?
আত্মীয়া: করতো তো ! বাসায় থাকলে সবই করতো ।
এই যে বললেন ঘুমাতো ?
আত্মীয়া: বেশিক্ষণ ঘুমায়তো না। উইঠাই রান্না করতো, বাবুর জন্য টিফিন করতো, কাপড় ধুইতো, ঘরটরও গুছায়তো। কিন্তু মেয়ে মানুষের এতো বাইরে যাওয়ার দরকার কি ! আর বয়সটা একটু বেশি ছিলোতো (২৬,ভদ্রলোকের ৪ বছরের ছোট কিন্তু) যুক্তি দেখায়তো ।
বাবুতো অনেক টাকা কামায় ! শ্বাশুড়ির সাথে ঘরে থাকবে, গল্প করবে, একটু সেজেগুজে থাকবে, পর্দা করবে, স্বামীর সেবা করবে ; এই না হইলে বউ ?
তাহলে ডাক্তার বিয়ে করালেন কেনো ? এরকম মেয়েতো সমাজে ঢের আছে ! এইচএসসি পাশ সাদা চামড়া দেখে বিয়ে করালেই পারতেন ।
আত্মীয়াঃ ছেলে এতো বড় ডাক্তার, একটা ডাক্তার মেয়ে না হইলে কি হয় ? বাবুর প্রায় বন্ধুদের স্ত্রীরাইতো ডাক্তার। এজন্য বাবুই ডাক্তার মেয়ে চাইছে । কে জানতো মেয়ে এমন হবে !!!
ডিভোর্সটা কে দিলো ?
আত্মীয়াঃ (মুখ বাঁকিয়ে) ডাক্তারনীটা
মেয়ে কেমন ছিলো বা তারা এখন কেমন মেয়ে আশা করছেন, সেই কথাগুলো আর শুনতে ইচ্ছে হলো না। আসলে রুচিতেই আসছিলো না।
কিন্তু শেষ উত্তরটা শুনে নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো, "বেশ করেছেন " ।
তবে এটুকু বুঝতে পারলাম, এ সমাজে বাবুরা সুশিক্ষিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু স্বশিক্ষিত হচ্ছে না !
সমাজে এখন ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে, আগে ডিভোর্স মানেই মনে হত নারীকে মুষ্টিবদ্ধ করার জন্যে পুরুষের এ এক মহান হাতিয়ার !
কিন্তু এখন স্ত্রীরাও স্বামীদের ডিভোর্স দিচ্ছে !
যদিও ভাঙ্গন কখনই ভালো নয় ।
তবে পচে যাওয়া আঙ্গুল বয়ে নিয়ে কষ্ট পাওয়ার চাইতে তা কেটে ফেলাই কি মঙ্গলজনক নয় ?

মায়ের মানসের অনাময

ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দ...