বৃষ্টি নেই কিন্তু দমকা বাতাসে বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থা ! আমি দাঁড়িয়ে আছি চৌরাস্তার মোড়ে, আশেপাশে আশ্রয় নেবার মতন দোকান কিংবা 'অভিভাবক শ্রেণির গাছ' কিছুই নেই !
শুধু আছেন এক ষাটোর্ধ্ব রিক্সাচালক চাচাজান আর তাঁর রিক্সা। চাচাজান বারবার অনুরোধ করছেন, 'রিক্সায় চাপেন আম্মা, আপনারে বাসের ধারে দিয়া আসি'।
আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিলো, এরকম একটা আবহওয়ায় এই বয়সী একজন মানুষকে এভাবে কষ্ট দিবো ! অগত্যা আর কোনো উপায় না দেখে আর চাচার অত্যন্ত স্নেহমিশ্রিত অনুরোধের কাছে হার মেনে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলাম।
এদিকে; কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা আবেগবশত হয়ে চাচাকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, 'আপনার ছেলে মেয়ে নাই ? এই বয়সে এত কষ্ট করে রিক্সা চালান ?'
চাচা উত্তরহীন, নিশ্চুপ।
আমি একটু থেমে আবারও শুধালাম, 'আপনার ছেলেমেয়েরা দেখেনা আপনারে?'
চাচা এবারও উত্তরহীন। তাই আমিও চুপ হয়ে গেলাম, মনে মনে খারাপ লাগছিলো, এই ভেবে যে; মানুষটার স্নেহের সুযোগ নিয়ে অনধিকারচর্চা করে বসলাম।
বেশকিছুক্ষণ পরে, যখন আবহওয়া কিছুটা অনুকূলে এলো, চাচা নিজ থেকেই কথা বলা শুরু করলেন।
যার সারসংক্ষেপ এমন, যৌবনে তিনি বিয়ের পর বিয়ে করে গেছেন, পরকীয়াও করেছেন। এদিকে প্রথম বউ, দ্বিতীয় বউ; এমনকি শেষ বউটার সন্তানের দায়িত্বও তিনি নেন নাই (বউয়ের সন্তান, নিজের নয় কিন্তু)। এদিকে যাদের সাথে পরকীয়া করেছেন তাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ামাত্র তিনি কেটে পরেছেন, পরে আর খোঁজ নেন নাই।
টাকা উপার্জন করে জুয়া খেলেছেন, বিড়ি টেনেছেন; মোদ্দাকথা জীবনকে 'উপভোগ' করেছেন। আর তার সেই কু-কৃতকর্মের (তার ভাষায়) কুফল তাকে এই বয়সে এসে ভোগাচ্ছে।
তার তিন স্ত্রীর ঘরে মোট ক'জন সন্তান তিনি জন্ম দিয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট হিসেবও তার নেই ! তবে প্রথম স্ত্রীর বড় দুই ছেলে সন্তান নাকি তার নেউটা ছিলো ভীষণ। বাবা বাবা করে তার জন্যে পাগল হয়ে থাকতো ! তিনিই তাদের উপেক্ষা করেছেন, অবহেলা করেছেন।
ঘটনা শেষে তিনি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
আজ তার অপরাধবোধ হয় ভীষণ ! যদি যৌবনে জীবনের লাগাম টেনে ধরতেন তাহলে এই বয়সে এসে তিনি নিশ্চয় একটা সম্মানের জীবন পেতেন।
চাচার কপোল বেয়ে অশ্রু ঝরে।
আশ্চর্যান্বিত আমি ভাবি, জীবন তাকে ভুগিয়েছে বলেই আজ তার মাঝে বোধ জেগেছে। সবার মাঝে শেষ জীবনে হলেও সত্যিই কি এমন বোধ জাগে ?
এ সমাজে একজন নারী যখন 'মা' হোউন; তা তিনি ষোড়শী-তরুণী-যুবতী-ধনী-গরীব যাই হোউন না কেনো, নিজের সাধ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সমাজ তাকে দেবীরূপে মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত করে। আর একজন পুরুষ যখন পিতা হোউন তিনি পিতা কম পুরুষই থাকেন বেশি, আর সমাজের কাছে তাই'ই সই !
আর এজন্যই সম্ভবত এই সমাজের লক্ষাধিক সন্তান নিজের পিতার কাছে নিজেরই মা'কে দিনের পর দিন অপদস্ত-অবহেলিত হতে দেখে, এমনকি কেউ কেউ মার খেতে দেখেও অন্ধভাবে নিজের পিতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে !
এদেশের 'বাবা'রা সত্যিকারের বাবা হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা শুধুমাত্র নিজের সন্তানের চোখে 'ভালো বাবা' হওয়ার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা 'শরীর সর্বস্ব পুরুষ' না হয়ে সত্যভানে একজন আন্তরিক বাবা হয়ে উঠুন।
No comments:
Post a Comment