Saturday, June 18, 2022

নিজ সন্তানের দায়িত্ব নিজ মাতার উপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক ?

আমার সামনের সিটে বসা আপুটি সম্ভবত সদ্য কোনো চাকুরিতে নিয়োগ পেয়েছেন, পোস্টিং চট্টগ্রামের বাহিরে কোনো এক গ্রামে বা মফস্বলে। 

নিশ্চয় সরকারি চাকুরি, না হলে অমন সাধ করে কে'ই বা গ্রামগঞ্জে যেতে চান ! 

তারই পাশে আরেকজন আপু, তারা দু'জন সম্ভবত বান্ধুবী সম্পর্কীয়। তাদের অতি উচ্চস্বরের আলাপন অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করার দরুন আমি অত্যন্ত অনাবশ্যকবশত তাদের আলাচারিতা শুনতে পাই এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হই। 

" তোর পোস্টিং তো *** জায়গায়, ওখানে তোর মেয়েকে নিয়ে যাবি কিভাবে?  ভালো স্কুলও নাই ! "

" নিবো নাতো ** কে  ! "

'' তাহলে ? " (অবাক হয়ে বান্ধুবি প্রশ্ন করলো) 

'' আম্মার কাছে থাকবে! '' (যেনো অতি সাধারণ একটা ব্যাপার) 

(এবার বান্ধুবিটি অতি আস্ফালনের সাথে নিজের কষ্টের ঝুলি মেলে বলা শুরু করলেন)

" তোর আম্মাতো অনেক ভালো, আমার আম্মাতো কোনোরকম বিয়ে দিয়েই শেষ, নিজে এখন ঘুরে বেড়ায়, কিছুদিন বড় ভাইয়ের কাছে আমেরিকা যায়, আবার দেশে এসে ছোটো ভাইয়ের সাথে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায় বড় ভাইয়ের কাছে। "

এতটুকু শোনার পর আমি নিজেই উপযাচক হয়ে সিট পাল্টে দূরে গিয়ে বসলাম, কেনো যেনো তাদের এই আলাপন আর শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। 

প্রসঙ্গত; আমাদের দেশের নারীরা এখন শিক্ষিত হচ্ছেন, ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার- উকিল - পুলিশ - ম্যাজিস্ট্রেট - সাংবাদিক - পাইলট - ব্যাংকার; এমন সব সম্মানজনক পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছেন, অর্থ উপার্জন করছেন। 

বেশ ভালো। 

কিন্তু নিজের মা'কে তাঁর সত্যিকারের 'দেয়টুকুন' দিতে পারছেন তো ? 

সেই মা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি নিজে শিক্ষিত হতে পারেননি বলে নানান গঞ্জনার শিকার হয়েছেন বিধায় নিজের মেয়েকে মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানটুকু আদায় করে দেওয়ার জন্যে নিজের কিশোরীবেলা-তরুণীকালের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন। 

এদেশে একটা ছেলে যখন ডাক্তার হয়, ব্যাংকার হয়, বড় চাকুরে হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই 'ছেলের' মায়ের চাকুরিজীবী ছেলের সন্তানদের নিয়ে অতো ভাবতে হয় না !  

বরঞ্চ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বেশ আরাম আয়েশেই জীবন পার করে দেন।

কিন্তু একজন নারী যখন ব্যস্ত কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ 'সেক্রিফাইস'টি করতে হয় 'মেয়ের মা'কেই । 

পৌঢ়কালেও তাঁকে নাতি-নাতনীদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয়। 

আর এখানেই সমাজে 'ছেলের মা' আর 'মেয়ের মা' এর মধ্যে বিস্তর তফাৎ লক্ষ্য করা যায় । 

আমাদের কাছে মা মানেই যেনো নিজের 'পিতার কেনা আজীবনের ভোগের সম্পত্তি', শুনতে কটু হলেও ক্ষেত্রবিশেষে এটাই সত্য। সন্তানের জন্যে আমৃত্যু নিজেকে বিসর্জন করে যাওয়াই যেনো মানুষটার জীবতকালের একমাত্র লক্ষ্য !  আকারে-প্রকারে-অবস্থায় সময়ের সাথে সাথে ছেলে-মেয়ে উভয়েই আমরা পাল্টালেও ভাবনার জায়গায়টায় কোথায় যেনো বুনোই থেকে গেলাম !

তা না হলে, সেই দুজন আপুর একজনের কথা ধরেই যদি বলি; নিজ মায়ের স্বাধীন-সুখী জীবন নিয়ে তিনি এতটাই অসন্তুষ্ট যে তার মা কেনো তার বান্ধুবির মায়ের মতন নিজের জীবনের শেষসময়টুকুও মেয়ের সন্তানদের জন্যে উদ্বাসন করছে না, সেই আস্ফালনে আপুটি মুখিয়ে উঠেছেন !  

তাহলে সমাধানটা কি ?

সমাধান খুবই সহজ। 

একজন চাকুরিজীবী নারীর সন্তানের প্রতি সেই নারীর মায়ের যে পরিমাণ দায়িত্ব, তার চাইতেও দ্বিগুণ দায়িত্ব বর্তায় সেই নারীর শ্বাশুড়ির উপর। কেননা, আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার দরুণ একজন পেশাজীবি নারীর আয়ের বেশিরভাগংশই ভোগ করেন তার স্বামী ও স্বামীর পরিবার (ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হতে পারে)।

এছাড়াও সন্তানেরা যেহেতু পিতার পারিবারিক পরিচয়েই বেড়ে ওঠে এবং সে পরিচয়কেই ধারণ করে, সে মোতাবেকও সন্তানের প্রতি সন্তানের পিতার পরিবারের দায়িত্বই বেশি বলা চলে। তবে সেক্ষেত্রেও ছেলের মা কিংবা পরিবার দায়িত্ব নিতে কতটুকু উৎসুক, সেটিও দেখবার বিষয়। 

তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সেই কর্মজীবী নারী এবং তার স্বামীর। বিয়ের আগেই তাদের উচিত সন্তানের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ও সমীচীন সিদ্ধান্ত নেওয়া।

'মেয়ের মা' বয়োজ্যেষ্ঠ বা অসুস্থ হয়েও নিজে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিতে চাইলেও তাঁর কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এদিকে,  তিনি সুস্থ-সবল-সামর্থ্যবান হয়েও যদি মেয়ের সন্তানদের দায়িত্ব নিতে না চান তবে তাঁকে 'চক্ষু লজ্জায় ফেলে', 'ইমোশন্যাল ব্লেকমেল' করে তাঁর কাঁধে এমন কর্তব্যবন্ধন আরোপ করাও অনুচিত।


তাই একজন কর্মজীবী নারীর মা'এর উপরই সবসময় সেই নারীর সন্তানদের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি দায়িত্ব দিতেই হয় তবে তার সাথে সেই নারীর আয়ের বেশিরভাগ অংশও দিতে হবে 'মেয়ের মা'কে'ই । আর এ ব্যাপারে একজন কর্মজীবী নারীর স্বামীকেও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী হতে হবে। 


পুণশ্চঃ ; ভাইয়ারা এবং ভাইয়াদের পরিবার, আপনারা একজন নারীকে 'চাকুরি করতে দিয়ে' মোটেও মহৎ কোনো কাজ করে ফেলছেন না। নিজের পছন্দমতন জীবন বেছে নেয়া মানুষ হিসেবে একজন নারীর জন্মগত অধিকার। 

তাই 'গাছেরও খাবেন, তলারও কুঁড়োবেন' সেই পুরাতন ধ্যানধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে নিজের বিবেককে জাগিয়ে তুলে তবেই সিদ্ধান্ত নিন ।।

No comments:

মায়ের মানসের অনাময

ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দ...