শহুরে ইটকাঠের জীবনে অভ্যস্ত আমি।
এখানেই আমার জন্ম, আমার বড় হয়ে ওঠা। গ্রামে বেড়াতে গিয়েছি মোটে দু'চারবার। তাও কখনই চব্বিশঘণ্টা জুড়ে থাকা হয়নি আমার। বাবার সাথে সকালে বাড়ি পৌছে গাড়িময় আম-কাঁঠাল-ধান-চাল নিয়ে বিকেলের মধ্যে বাসায় গমন, এই'ই ছিলো আমার গ্রাম ভ্রমণ !
আর ঠিক এই কারণে দেশের নব্বই শতাংশ মানুষের জীবন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না, এ ব্যাপারে আমি ছিলাম এক্কেবারে মূর্খ-অজ্ঞ !
আর ঠিক এরকম এক অজ্ঞতার দরুণ আমি আমার জীবনের সবচাইতে বড় অপরাধটা করেছি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।
নিজ গন্ডি থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই প্রথম নিজের পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ এবং নানান জেলার নানান মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময়টাতে অনেকের অনেককিছুই আমার 'বেঠিক' মনে হত, তার মধ্যে অন্যতম ছিলো 'ভাষা' এবং 'ম্যানার' বা 'আচার-আচরণ-আদব' !
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে এমন একজন মানুষ 'শুদ্ধ উচ্চারণে' কথা বলতে পারছেন না, আদবের সাথে 'খেতে-পড়তে-বসতে' পারছেন না এবং এত এলোমেলো 'বাচনিক, বিশেষত অযাচিত অবাচনিক' যোগাযোগ করছেন, এটা আমি মেনেই নিতে পারতাম না। যার দরুণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের জানা-শোনা-শিক্ষার নিরিখে যে অনুমাপক আমার মানসিকতায় তৈরি হয়েছিলো সে অনুযায়ী তথাকথিত 'স্মার্ট' না হলে আমি বরাবরই এড়িয়ে যেতাম।
সে সময়টাতে আমার একবারও মনে হয় নি, এখানে যারা পড়তে এসছেন তারা কতটা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পড়তে এসছেন। এ অবধি পৌছুতে কত কাঠ-খড়ই না তাদের পোড়াতে হয়েছে! একেকজনের এ পর্যন্ত আসার পেছনে কত শত সংগ্রামের গল্পই না লুকিয়ে আছে !
আমার বাবা গ্রামের ছেলে ছিলেন, তিনিও একদিন এভাবে নিজের ঘর-বাড়ি সব পেছনে ফেলে শহরে পড়তে চলে এসেছেন বলেই আজ আমরা এমন একটা তৈয়ারি জীবন পেয়েছি!
গেলো তিন বছর যাবত দেশের নানান জেলা আর প্রত্যন্ত কিছু গ্রাম ঘুরে দেরিতে হলেও এই উপলব্ধিটা আমার হয়েছে। এবং প্রতি মুহূর্তে আমি অনুতপ্ত হয়েছি এবং অনুভব করেছি নিজের মানসিকতার মানদণ্ডে ফেলে কাউকে আচার-বিচার করাটা একদম ঠিক নয়।
এদেশে এমন কত স্থান আছে; পানি পথ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই, চট্টগ্রাম থেকে চব্বিশ ঘন্টার দুরত্ব কিংবা কিছু জায়গা এতই অনুন্নত যে সামান্য ঝড়েও বেশিরভাগ মানুষ মাথা গোজার ঠাঁই হারায়, বিশুদ্ধ জল পায় না, বিদ্যুৎ নেই; যেখানে সে সব জায়গা থেকে শুধুমাত্র পড়াশুনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার পর্যন্ত আসাটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে 'শুদ্ধ সাবলীল উচ্চারণে কথা বলা, খাবার খাওয়ার ম্যানার, বসার ম্যানার, মেয়েদের সাথে কথা বলার ম্যানার' বিষয়গুলোতো ভীষণ তুচ্ছ !
এইতো গতকালই, রেস্টুরেন্টে বেশ ক'জন মেয়ে পাশের টেবিলে বসা কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে হাসছিলেন। ছেলেগুলো সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী এবং তারা শহরে এসেছেন খুব বেশিদিন হয় নি হয়ত, সম্ভবত প্রথম বা বড়জোর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কথায় স্পষ্ট গ্রাম্যটান, চামচ দিয়ে খাবেন না হাত দিয়েই খেয়ে নেবেন তা নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তা করছিলেন সবাই মিলে, এদিকে আবার চামচ দিয়ে কিছুতেই পাতের মাংসটাকে বাগে আনতে পারছিলেন না। তাদের মুখের ভাষা, খাওয়ার আদব নিয়ে পাশের টেবিলে বসা মেয়েগুলো হেসে লুটিয়ে পরছিলেন। আমি নিশ্চিত তাদের বাবা না হলে দাদা, কিংবা দাদার দাদার অবস্থাও একসময় এমনই ছিলো, কিংবা তার চাইতেও খারাপ। ভাগ্য ভালো বিধায় পিতৃগুণে কিংবা পূর্বপুরুষদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে তারা তাদের জীবনে সেই ছেলেগুলো থেকে কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে গেছেন।
'আমরা এগিয়ে গেছি'; তার মানে এই নয় যে যারা কথায়-চলায়-চিন্তায় একটু 'পিছিয়ে' আছেন, তাদের আমরা হেয় প্রতিপন্ন করবো।
প্রকৃতি কাউকেই আজীবন পিছিয়ে রাখে না, আবার কাউকে আজীবন এগিয়েও রাখে না। যারা আজকে এগিয়ে আছেন, কে জানে! তারাই কয়েক প্রজন্ম পরেই হয়ত আবার পিছিয়ে পরবেন। তাই আমাদের উচিত সকলের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
'ভাষা-আদব-কথা-বলা-চলা' দিয়ে কাউকে আচার বিচার না করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ।।
No comments:
Post a Comment