Saturday, March 28, 2026

মায়ের মানসের অনাময

ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দড়ি লাগিয়ে দিলো! 

আপনি ঘুম থেকে উঠে অনিয়ন্ত্রিত বেগ নিয়ে শৌচাগারে গেলেন, আপনার দড়িতে টান পড়লো। আপনি তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে শৌচাগার ব্যবহার করে বের হয়ে আসতে বাধ্য হলেন, আবার স্নানেও সেই একই দশা হলো; গতরে দু'ফোঁটা পানি ঢালবার আগেই দড়ি ধরে টান পড়লো আপনার! কেবল তাই'ই নয়, প্রচন্ড ক্ষুদা নিয়ে আপনি খুব আয়েশ করে খেতে বসলেন, অমনি আপনার দড়িতে টান পড়ে গেলো, কোনোক্রমে নাকে-মুখে দু'মুঠো গুজেই দৌড়াতে হবে আপনাকে!  তেমনই একটু নিজের পছন্দের কাজটা করতে বসলেন, বইটা পড়তে চাইলেন, কফির মগ হাতে বসন্তের বাতাসে বারান্দায় দাঁড়ালেন, প্রিয় বন্ধুর সাথে বহুদিন পর ফোনালাপে মজলেন; তৎক্ষণাৎ কোমরের দড়িতে টান পড়লো আপনার। এখানেই শেষ নয়, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে আপনি ঘুমুতে গেলেন, চোখ লেগে আসার দেড় থেকে দু'ঘন্টার মধ্যেই আপনার দড়িতে টান পড়লো! এভাবেই চললো সারারাত, আপনি ঘুমালেও আপনার মস্তিষ্ক ঠিকই সজাগ থাকলো, কারণ যেকোনো সময় আপনার কোমড়ের দড়িতে টান পরতে পারে! 


এরকম একটা জীবনের কথা ভাবাই যায় না, তাই না? 


যেখানে নিজের সময়, নিজের জগৎ, নিজের জীবন আর জীবনের দু'দণ্ড স্বস্তি বলতে কিচ্ছু নেই ! 

অথচ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া অন্তর একজন মা'কে বছরের পর বছর, তার প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ঠিক এভাবেই কাটাতে হয় !

একটা অদৃশ্য দড়ির মতন সন্তান তার মা'কে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে! মায়ের নিজের বলতে তখন আর কিছুই থাকে না! এমনকি একজন সদ্যোজাত সন্তানের মা নিজ শরীরের সত্ত্বাধিকারও হারিয়ে ফেলেন! 


আমরা যখন একজন মায়ের ত্যাগের কথা লিখি, কিংবা মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি; তখন মা আমাদের জন্যে ঠিক কতটা কায়িক শ্রম করেছেন, শারীরিকভাবে কতটা খেটেছেন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটাই বলি বারবার ! 

কারণ, একজন মায়েরও যে একটা মানসিক চাহিদা থাকতে পারে, আর সেটা অনায়াসে এতটাই নীরবে তিনি ত্যাগ করেন যে সেই বিষয়টি বরাবরই সকলের অবচেতনেই থেকে যায়!


একজন মায়ের ত্যাগ কেবলই রান্না করা আর পছন্দের খাবার নিজে না খেয়ে সন্তানের পাতে তুলে দেয়া নয় কিন্তু!

একজন নারী যখন জানতে পারেন তিনি মা হতে চলেছেন, তখন অনাগত সন্তানের কথা ভেবে এবং যখন তিনি মা হোউন, তখন দুগ্ধ পান করা সন্তানের সুস্বাস্থ্যের স্বার্থে তার একান্ত পছন্দের বহু খাবার তাকে ত্যাগ করতে হয়! শারীরিক নানাবিধ পরিবর্তনের জন্য তার পছন্দের পোশাক পরা থেকেও বিরত হতে বাধ্য হোউন তিনি।

যেই মা বই পড়তে ভালোবাসতেন, যেই মা ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন, কিংবা অবসরটা অন্য কোনো শখের কাজ করে কাটাতেন; মা হওয়া মাত্রই শখগুলো যেন সব তালাবদ্ধ করে আলমারিতে তুলে রাখা হয়! বেশিরভাগ মায়েদের ক্ষেত্রে তালাবদ্ধ সেই আলমারি তাঁর পুরো জীবদ্দশায় আর খোলাই হয় না! 


এই যে মুহুর্তেই নিজের মানসিক চাহিদাগুলোকে বিদায় জানিয়ে সন্তানের জন্য আপাদমস্তক একজন যান্ত্রিক মানুষে রূপান্তিত হওয়ার মাধ্যমে একজন মা যেই ত্যাগ স্বীকার করেন, মায়েদের সেই ত্যাগের কথা বরাবরই ঊহ্যই থেকে যায় ! 


এ কারণে তীব্র সচেতনতা কিংবা কখনো-সখনো দয়াপরবশত মায়েদের 'শারীরিক যত্নের' বিষয়ে খানিকটা আন্তরিক হওয়ার উদ্যোগ নিলেও, মায়েদের 'মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের' বিষয়টি বরাবরই অবহেলিতই রয়ে যায়।


তাই সদ্যোজাত সন্তানের মা থেকে বয়োবৃদ্ধ মা; প্রতিটি মায়ের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়াও বোধহয় একান্ত জরুরি ! 


Saturday, October 8, 2022

নারীর নির্বেদ

নব্বই দশকের বেশিরভাগ মায়েরা ভেবেছেন "শিক্ষাতেই আমার মেয়ে সন্তানের মুক্তি"। তাঁদের সেই ধারণাটা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না ! সেই মায়েদের বেশিরভাগই নিজেরা পড়াশুনা করতে পারেন নি, অনেক মায়েদের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এদিকে অনেকে পড়াশুনা করলেও নিজের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাননি। তাই তাঁদের মাঝে এরকম বিশ্বাস তৈয়ার হওয়াটাই স্বাভাবিক যে আমার মেয়ে সন্তানটি যদি পড়াশুনা করে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পা


রে তবেই তাকে আর তার পুরো জীবনটা হেঁসেলে বিসর্জন দিতে হবে না, মানুষ হয়েও ঘরের কোণের আসবাব এর মতন নিষ্ক্রিয়-অকেজো হয়ে জীবনটা বয়ে নিয়ে যেতে হবে না, যেমনটা মায়েদের সাথে ঘটেছে।

এদিকে; তারই নিরিখে বাঙালি মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছেন ঠিকই, অনেকেই হয়ে উঠছেন স্বশিক্ষিত। কিন্তু সেটিই বেশিরভাগের জীবনে আশীর্বাদ না হয়ে, হয়ে উঠেছে অভিশাপ। 

আর সেখান থেকেই বেশিরভাগ নারীর জীবনে শুরু হয় হতাশা ! 

এক্ষেত্রে খানিকটা অপ্রিয় শোনালেও বলা চলে, এর দায় পুরোটাই বাবা-মায়ের উপরেই বর্তায়। নব্বই দশকের বাবা-মায়েরা তাদের মেয়ে সন্তানকে শিক্ষিত করে তুললেও, নিজের ছেলে সন্তানকে স্বশিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন থেকেছেন। 

তাই দেশে শিক্ষিত ছেলের অভাব নেই বটে, কিন্তু একজন শিক্ষিত-স্বাধীনচেতা নারীকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে তাকে ধারণ করার মতন স্বশিক্ষিত ছেলে হাজারে হয়ত একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এদিকে; নব্বই দশকের বাবা-মায়েরা নিজের মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে উদার মনোবৃত্তি পোষণ করলেও ছেলের বউ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের বরাবরের মতন ওই 'দাসী'ই চাই ! সামাজিক স্টেটাস বজায় রাখার জন্যে শিক্ষিত মেয়ে না হলেতো চলেই না, কিন্তু দিনশেষে দাসীবৃত্তি না করলে তার মার্জনা নেই !  উলটো তাকে নানান ধরনের মানসিক অত্যাচারের স্বীকার হতে হবে। 

তাই নারী শিক্ষিত হোউক আর নিরক্ষর, কর্মজীবী হোউক আর কর্মহীন কিংবা গৃহিণী; হতাশা থেকে নারীর মুক্তি নেই। আর তার জন্য ওই অনেকটাই দায়ী নব্বই দশকের বাবা-মায়েদের কপটচারী মনোভাব। তাঁরা নিজের মেয়ে সন্তানকে উন্নত জীবন যাপনের লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন, অথচ বীপরিতে ছেলে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত-স্বাধীনচেতা সঙ্গিনীকে ধারণ করার মতন উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেননি, এক্ষেত্রে নিজেরাও নিজেদের কপটচারী মনোভাব পরিবর্তনে নারাজ; যার বলির পাঠা বরাবরের মতন একজন নারীকেই হত হয়, হতে হচ্ছে।


Monday, September 12, 2022

সৃজিত সংসার

 এসো ...।

হাতটা ধরো,


কোথায় যাবো আমরা ? 


সুখের নীড়ে, আমার সৃজিত সংসারে ।


সেতো "তোমার" ! 


যা আমার তা কি তোমার নয়? আমি মানেই তো তুমি । তুমি আমার ছায়া, আমার অর্ধাঙ্গীনি । 


অর্ধাঙ্গীনি কি করে ছায়া হয় ? 

আর যা তোমার তাই তাও আমার নয় । 

তোমার-আমার মিলেই আমাদের হয় । 


ছায়াতে মানুষেতে কি আর ভালোবাসা হয় ?

ছায়া বাঁচে দয়া আর করুণায়। 

তাই আমিতো ছায়া হতে চাই না। 

মানুষ হয়ে তোমার হাতে হাত রেখে পায়ে পা মিলিয়ে এই তোমারই পাশে তোমাকে ভালোবেসে একসাথে পথ চলতে চাই ।


আদতে তার কোন প্রয়োজন আছে কি ? আমিই তো তোমার পথের দিশারী । আমার আলোয় আলোকিত হবে তুমি । 


জানোতো, চাঁদ বাঁচে সূর্যের দয়ায়, 

সূর্যের দয়া ছাড়া অন্ধকার সেই চাঁদের কথা কেই বা জানতে চায় ?

তোমার আলোয় না হয় ক্ষণিকের জন্যে নিজেকে আলোকিত করলাম, 

কিন্তু সে আলো ব্যতীত আমি যে অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে কাঁদবো, তাই নিজের আলোয় আমার আলোকিত হওয়া চাই । 


জানোতো? 

দুটি আলোকিত হৃদয়েরই কেবল হৃদ্যতা হয়, আর সেই হৃদ্যতা থেকেই হয় ভালোবাসা ।

আধাঁরে আর আলোতে যে সম্পর্ক ? 

তা হতে পারে দয়ার, করুণার, শোষক-শাষিত কিংবা  প্রভূ-ভৃত্যের ;

আমরা প্রায়শই তা প্রেম ভেবে ভুল করি । 

একার আলিঙ্গনে কি আর প্রেম হয় !


তাই তোমার এই আলোকিত হৃদয়টিকে ভালোবাসতে হলে আমার হৃদয়খানি আলোকিত করার যে বড় বেশী প্রয়োজন  ।।

Friday, July 22, 2022

নভে অনুস্মরণ

 হঠাৎ আলমারির কোণ থেকে বেরিয়ে এলো বহুদিন পরা হয় না এমন একটি পোষাক, একসময় হয়ত এটিই ছিলো সবচাইতে পছন্দের পোষাক। সময়ের সাথে সাথে পোষাক তার যুগোপযোগিতা হারিয়েছে, আলমারির উপরের তাক থেকে ধীরে ধীরে সে অকেজোদের দলে চলে এসেছে ।

কিন্তু অকস্মাৎ চোখে পরে যাওয়া পোশাকটি যখন স্পর্শ করা হলো তখন হয়তো মনের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো, কিংবা গাল বেয়ে টপ টপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পরতে লাগলো। একটা পোষাক কত শত স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। হয়ত এই পোশাকটিই ছিলো বহু বছর আগে "তার" সাথে প্রথম দেখা হওয়ার সেই দিনটির পোশাক, কিংবা শিক্ষাজীবনের শেষ দিনটিতে পরা পোষাক, বা এই পোশাকটিই হয়তো "তার" সাথে কাটানো শেষ ক্ষণটির স্মৃতি। এমন আরো কত কি'ইতো হতে পারে ।

আমরা মানুষেরা বোধহয় কখনই কোন স্মৃতি ভুলে যাই না। নিজের মাঝে ভুলে থাকার একটা অভ্যাস গড়ে তুলি মাত্র। আর তাই তো অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক সময় অনেক স্মৃতি আমরা মনে করতে পারি না, আবার কখনো কখনো অবেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত কত স্মৃতিই না মনে পরে যায়। আমাদের স্মৃতি গুলো লুকিয়ে থাকে আমাদের চারপাশে।

দূর থেকে ভেসে আসা বছর কয়েক না শোনা কোন গানের সুর আচমকাই মনকে বিমোহিত করে তোলে। মনে পরে যায় হারিয়ে যাওয়া হাজারো সুখো-স্মৃতির কথা। কষ্টগুলো হৃদয় নিংড়ে অশ্রু হয়ে উপচে পরে। এমনি ভাবে কখনো কখনো কোন গানের কলি বা কবিতা মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া অনেক স্মৃতি। এমনকি অপরিচিত কোন সুগন্ধীও, হঠাৎ মনে করিয়ে দেয় কোন এক পরিচিত জনের স্মৃতি। আবার কখনো কখনো কোন মুহূর্তও মনে করিয়ে দেয় হারানো কোন এক মুহূর্তের কথা।

আমরা স্মৃতি ধারণ করি, কিন্তু স্মৃতি বয়ে চলি না। তাই আপাতপক্ষে আমরা অকপটেই আমাদের কোন আপনজনকে, কোন মুহূর্তকে ভুলে থেকে ভালো থাকার কথা বললেও; আদৌ আমরা ভালো থাকি কি ?






Tuesday, July 19, 2022

দাম্পত্য জীবনের ত্যাগের প্রতি কেনো আমরা উদাসীন !

 নারীদের ক্ষেত্রে হরহামেশা এমনটা দেখা যায় না বললেই চলে।

তবে ক্ষেত্রবিশেষে অনেকসময়ই দেখা যায়, একজন স্ত্রী তার স্বেচ্ছাচারিতার বলে একসময় তার স্বামীকে তার নিজের পরিবার ছাড়তে বাধ্য করেন, নিজের অস্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে স্বামী ব্যক্তিটিকে বাধ্য করেন 'মুখে রক্ত তুলে' আয় করতে, আর সব আদায় করা হয়ে গেলে নতুন স্বপ্নের খোঁজে নতুন কারো সাথে নতুন কোনো জীবনে পাড়ি জমান !

এদিকে, পুরুষেরা অল্প বয়সে তার সঙ্গিনীটির প্রেমে পরেন, পরবর্তীতে তাকে স্ত্রী করে ঘরে তুলে সেই ঘরশুদ্ধ পরিবার-পরিজন-আত্নীয়-অনাত্মীয়, এবং সকল দায়-দায়িত্ব স্ত্রীটির দু'কাঁধে চাপিয়ে দেন। "এই'ই তো ভালোবাসা" ভেবে স্ত্রী বেচারি মুখ বুজে সব দায়িত্ব পালন করতে করতে একসময় নিজের যত্ন নিতেই ভুলে যান! আর তখনই স্বামী ব্যক্তিটির মনে হয় এই স্ত্রী তো তার সাথে একেবারেই বেমানান ! এক সময়কার সুদর্শনা ও মেধাবী একজন নারীকে যে আখমাড়াই এর মতন নিংড়ে নিংড়ে তার সবটুকুন শুষে নেওয়া হয়েছে, স্বামী ভদ্রলোকটির ঘূর্ণাক্ষরেও তা মনে পরে না ! তখন তিনি বিতিব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে পরেন নতুন সঙ্গিনীর সন্ধানে। হয় বর্তমানকে ছেড়ে ভবিষ্যৎকে বিয়ে করে নেন, আর খুব 'দুর্নীতিগ্রস্ত' হলে বর্তমানকে ব্যবহার করে নিজের সামাজিক মর্যাদাকে সাম্যাবস্থায় রেখে ভবিষ্যৎ এর সাথে 'কোয়ালিটি' সময় কাটিয়ে বেড়ান।


ছবি: ইন্টারনেট

বলা চলে; যারা ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তারা প্রতিটা মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কারণ সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রাণ দিয়েছেন, রিজিক দিয়েছেন। অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিতে যা কিছু অন্যায় তা থেকে বিরত থাকেন ওই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই। একইসাথে বাবা-মা পছন্দ করেন না, এমনকিছু করতেও আমরা নারাজ, প্রতিমুহূর্তে বাবা-মায়ের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ বাবা বুকের রক্ত মুখে তুলে আমাদের মানুষ করেছেন, মা আমাদের জন্যে নিজের এক সময়কার সব শখ-আহলাদ ত্যাগ করেছেন।

অথচ এই আমরাই নিজের স্বামী কিংবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে এমনটা ভাববার ভাবনাটুকুনও ভাবি না। বাবা যেমন নিজের আরাম-আয়েশ শিকেয় তুলে সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবেন, স্বামীরাও কি একইভাবে স্ত্রীদের খেয়াল রাখেন না? (ব্যতিক্রম তো আছেই)স্ত্রীর শখের শাড়িটি কিনে দেওয়ার জন্যে স্বামী ভদ্রলোকটি হয়ত অনেকসময়ই ইদ বা পূজোয় নিজের পছন্দের কাপড়টি কেনেন না! অনেকেই আবার অসুখের দিনগুলোতে রাত জেগে স্ত্রীর সেবা করেন। অন্যদিকে, নিঃসন্দেহে বলা যায় স্ত্রীরা একেবারে নিজেদের সবটুকুন দিয়ে স্বামী ও তার পরিবারকে আগলে রাখেন। অবলীলায় নিজের ছোটো থেকে বড় এমন হাজারো ইচ্ছের অপমৃত্যু ঘটিয়ে দেন হাসিমুখেই !

যদি সৃষ্টিকর্তার দানের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতাবোধ করি, বাবা-মা-ভাই-বোনের ত্যাগের বীপরিতে আমরা কৃতজ্ঞতাবোধ করি; তবে যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের অতীত না জেনে, ভূত-ভবিষ্যৎ না ভেবেই নিজের জীবনটাকে মানুষটার জীবনটার সাথে জড়িয়ে নিলো, কোনোরকম কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও কেবল আত্মিক বন্ধনের নিমিত্তে একে অন্যের জন্যে ওমন বড় বড় বলিদান করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো; সেই সম্পর্ক কি এত ঠুনকো হতে পারে ? সেই সম্পর্ককে যেনো স্রেফ একটা 'অভিলাষ' বলেই চালিয়ে দেওয়া যায়। যখন ইচ্ছে হয় মনের দোহাই দিয়ে একে অন্যকে ছেড়ে চলে যাওয়া যায় ! বেশিভাগ সময়ই চলে যাওয়া মানুষটা যাবার বেলায় রেখে যাওয়া মানুষটার দিকে ফিরেও তাকান না !

মানুষের মনতো? ঋতুর চাইতেও দ্রুত পালটায়। তা সে হতেই পারে !

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাবা-মা-পরিবার ও রক্তের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতাবোধ-ত্যাগ এই অনুভূতিগুলো যদি আমাদের এত ভাবায়, তবে স্বামী কিংবা স্ত্রীর ত্যাগের প্রতি কেনো আমরা এত উদাসীন। কেনো সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'কৃতজ্ঞতা' নামক বোধটি আমাদের মাঝে জেগে উঠে না ! কেনো সেই অঙ্গীকারকে সহজেই অস্বীকার করার প্রচলনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমরা !

কেনো অধুনাকালে একে অন্যের জন্যে করা ত্যাগের দিকে তাকানোর চাইতে একে অন্যকে 'ত্যাগ' করার ক্ষেত্রেই আমরা অতি উৎসাহী হয়ে উঠছি ?

Like
Comment
Share

Saturday, July 16, 2022

ধর্মের দোহাই নয়, বিবেক বিবেচনায় শিশুর মাঝে জাগিয়ে তুলতে হবে মানবিকতা

আমার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নী দারুণ চঞ্চল, প্রাণোচ্ছলও ভীষণ। ইদানীং দেখছি সে নতুন একটা বিষয় শিখেছে। 

যখন তাকে কোনোকিছু করতে নিষেধ করা হয়, বা কোনো কিছু করতে বলা হয়, কিংবা কোনো কিছু হয়ত তার মন মতন ঘটছে না, কিন্তু সে ঘটাতে চাচ্ছে; তখনই সে "ধর্ম" বিষয়টাকে নিয়ে এসে তার কার্যসিদ্ধির চেষ্টা করে৷ এই যেমন সে তার মায়ের ব্যাগ খুলে ব্যাগ থেকে তার মায়ের মোবাইল ফোন নিতে যাচ্ছিলো, ওমনি আমি বিষয়টা দেখামাত্রই তাকে বললাম, "অন্যকে না বলে অন্যের জিনিস ধরাতো খারাপই, তার উপর তুমি মোবাইল ফোন ধরছো, এটাতো আরও খারাপ।" 

উত্তরে সে আমাকে বললো, "মায়ের মোবাইল ধরা সুন্নত।"

ঠিক এরকমই, 'চকলেট খাওয়া সুন্নত, দুপুরে ঘুমানো গুণাহ, রাতে ভাত না খেয়ে পিৎজা খাওয়া ফরয, ছোটো বাচ্চাদের মোবাইলে গেম খেলতে দেওয়া ফরয'; এরকম নিজের সুবিধামতন মনগড়া সুন্নত আর ফরয সে দিন দিন বানিয়েই চলেছে !  

এই বিষয়টা তার মধ্যে কেনো গড়ে উঠেছে ? 

কারণ তার আরবী শিক্ষক তাকে কোনোকিছু শেখানোর ক্ষেত্রেই বলেন, এমুক করা গুণাহ, তমুক করা সওয়াব। বেশি দুষ্টামি করলে বলেন, না পড়ে দুষ্টামি করা গুণাহ। এ কারণেই তার মনে হয়েছে এ জগতে সবকিছুই কেবল গুণাহ-সওয়াব আর পাপ-পুণ্যের দোহাই দিয়ে খুব সহজেই আদায় করা যায়।

বাস্তবিক, আমরা প্রায় সময়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে খারাপ কোনো বিষয় থেকে আমাদের শিশুদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করি। যেহেতু এই পন্থা সংক্ষিপ্ত আর সহজ, এজন্য বরাবরই আমরা এই পথটাকেই বেছে নেই। এটা করলে গুণাহ হবে, ওটা করলে পাপ হবে, সেটা করলে পুণ্য হবে; এতটুকুন শিক্ষা দিয়েই আমরা রীতিমতন হাত ধুয়ে ফেলি। 

এইতো সেদিন একটা সাত বছর বয়সী শিশুকে দেখছিলাম স্টিলের একটা গ্লাস বা এরকম কিছু একটা দিয়ে ফ্লোরে আঘাত করে খুব জোরে জোরে শব্দ করছিলো। শিশুটির মা এই বলে তাকে বারবার সতর্ক করছিলেন, এরকম বিচ্ছিরি শব্দ করো না আল্লাহ গুণাহ দিবেন। শিশুটি চারপাশে তাকালো, আবার শব্দ করতে লাগলো ! মা আবারও একই কথা বলে শিশুটিকে সতর্ক করলেন আর এরপরে পিঠে দুচার ঘা দিয়ে বসলেন। 

অথচ মা যদি একটু ধৈর্য্য ধারণ করে শিশুটিকে ঠিক এভাবে বুঝাতেন, বাসায় অন্য মানুষেরা আছে, তার অসুস্থ দীদা আছেন, সে এই শব্দ করাতে দীদার ঘুমুতে, বিশ্রাম নিতে কষ্ট হচ্ছে, আর এভাবে মানুষকে কষ্ট দিলে সৃষ্টিকর্তাও বিমুখ হতে পারেন। তবে নিশ্চয় শিশুটি বুঝতো, এবং এই শিক্ষা ভবিষ্যতে তাকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করতো। এই ছোট্ট একটা শিশু গুনাহ-সওয়াব কিংবা পাপ-পুণ্যের কি'ইবা বুঝবে, কতটুকুনই আর বুঝবে !  অথচ মা ধরেই নিয়েছেন পাপ-পুণ্যের ভয় কিংবা প্রলোভন দেখালেই তার অবুঝ সন্তানটি তার কথা শুনবেই ! 

এভাবেই অনেকটা আধেক আর একরকম ভ্রান্ত বিধিনিষেধের বেড়াজালে বেড়ে উঠে আমরা অনেকেই হয় অত্যন্ত অবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠি, কিংবা পরিণত বয়সে ভন্ড হয়ে উঠি। নিজেদের মনগড়া পাপ-পুণ্য আর গুণাহ-সওয়াবের তালিকা বানিয়ে সমাজ থেকে নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধাটুকুন আদায় করি, অন্যকে শোষণ ও দাবিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করি। যে ধর্মের সাথে মানবিকতা, ক্ষেত্রবিশেষে সত্যিকারের ধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্কই থাকে না !

Saturday, July 9, 2022

বাঙালি নারীর 'ব্যক্তি-অনধীনতা'

'ব্যক্তি স্বাধীনতা' আসলে কি ? 
আদতে এদেশে নারীদের 'ব্যক্তি স্বাধীনতা' আছে কি ? 
ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, চাকুরিতে যোগদান, অর্থ উপার্জন; এ সকল বিষয় একজন নারীর জীবনে আদৌ 'ব্যক্তি স্বাধীনতা' এনে দিতে পারে কি ? রাস্তায় যারা ইট ভাঙ্গছেন তাদের মাঝে এমন অনেক স্বাধীনচেতা নারীদের দেখা যায়, যাদের স্বামীদের কিংবা পরিবারের অতটুকুন সাহস হয় না স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর। 

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এমন অনেক নারীদের দেখা যায় যারা নিজের ও স্বামীর পরিবার কিংবা স্বামীর কথার বাহিরে খুঁটোটি নাড়বার সাহসটুকুনও রাখেন না ! ভারতীয় উপমহাদেশে আবহমান কাল জুড়ে থাকা সংস্কৃতি অনুযায়ী শিশু থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত নারীকে তার জীবনের প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারে পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় এবং তার কৃতকর্মের জন্য পরিবারের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। একইভাবে সেই নারী যদি কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোউন, তবে অনুরূপভাবে তার পরিণত জীবনাকালেও কোথাও যেতে হলে, কিছু করতে হলে তাকে কেবল তার স্বামীর কাছেই নয়, শ্বশুর-শ্বাশুড়িসহ পরিবারের প্রায় প্রত্যেকের সদস্যের কাছে 'অনুমতি প্রদানের আবেদনপত্র' দাখিল করতে হয়, সেই আবেদনপত্র আবার তাদের মন-মতি-মর্জি মতন মঞ্জুর হতে পারে, আবার খারিজও হতে পারে ! এভাবেই দেখা যাচ্ছে, একজন নারী শিশু থেকে যৌবনকালোবধি বাবা-মা তথা নিজের পরিবার, পরিণত বয়সে স্বামী ও সেই স্বামীর পরিবারের দ্বারা এবং শেষ বয়সে নিজ সন্তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোউন। 

অন্যদিকে; যদি কোনো নারী স্বেচ্ছায় কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হোউন, তারও কি শেষ রক্ষা মেলে জবাবদিহিতার ওমন খুঁতেল সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেওয়ার ? 'কেনো-কোথায়-কখন-কিভাবে-কেনো না-কি কারণে'; এই প্রশ্নগুলো প্রতি মুহূর্তে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় ! তাই বলা চলে; এদেশের বেশিরভাগ নারীরই জীবন কেটে যায় 'জবাবদিহিতা আর অনুমতি গ্রহণের' বেড়াজালে। 

নারীর ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার এই বিতিকিচ্ছিরি সংস্কৃতি বয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে সমাজ ও পরিবারের একটি 'অনুত্তম' উত্তর বা খোঁড়া যুক্তি হলো; নারীর নিরাপত্তা । 

দারুণতো ! 

বনের পাখিকে নিরাপত্তার খাতিরে আর যত্নের দোহাই দিয়ে খাঁচায় পুড়ে রাখাটা যদি কোনো জাতির নিকট যৌক্তিক হয়, তবে অনায়াসেই বলা চলে, হয় সে জাতি 'অস্বভাবী' কিংবা নেহাতই 'বৈড়ালব্রতী'। যদি সত্যিই কেউ বনের পাখির যত্ন নিতে চায় আর তার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে, তবে তার জন্যে অভয়ারণ্য তৈয়ার করা প্রয়োজন, যেখানে সে নিরাপদে কিন্তু নিজের মনের মতন বিচরণ করতে পারবে। 

কারো নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাকে কুক্ষিগত করার আভ্যন্তরীণ অর্থ হলো কেবলই তার ব্যক্তিত্ব আর  ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করা, একইসাথে তার ব্যক্তিগত জীবনে আধিপত্য বিস্তার করে নিজের ক্ষমতা জাহির করার মতন গর্হিত আচরণ প্রকাশ করা।  

তা সে যা বলছিলাম, ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, চাকুরিতে যোগদান, অর্থ উপার্জন; এসবকিছুর কোনোকিছুই কখনই একজন নারীর জীবনে তার 'ব্যক্তি স্বাধীনতা'কে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, যদি না নারী নিজ জীবনের সকল দায় ও দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে পারেন। সম্ভবত নিজ জীবনে ব্যক্তি স্বাধীনতার মতন মূল্যবান একটি সম্পদের বীজ বপনের প্রধান নিয়ামক এটিই। অর্থনৈতিক দায়িত্বতো অবশ্যম্ভাবী, তার সাথে আরেকটি আবশ্যিক বিষয় হলো নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করা। যেনো সেই দোহাই দিয়ে পরিবার কিংবা সমাজ একজন নারীর ব্যক্তিত্ব ও তার ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতাকে খর্ব ও কুক্ষিগত করতে না পারে   ।।

Sunday, July 3, 2022

ফিনিক্স পাখির জীবন

ছিপছিপে গড়নের শান্ত মেয়ে মোনালিসা আপা। আমার সাথে পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। একই এলাকায় থাকার সুবাদে যাওয়া আসার পথে টুকটাক হাই হ্যালো, ওই পর্যন্তই ছিলো। 

তবে তাকে যতবারই দেখেছি, তার হরিণের মতন মায়াবী চোখগুলো বরাবরই আমার নজর কেড়েছে। কি যেনো আছে তার চোখ জুড়ে, কেমন যেনো একটা মাদকতা, একবার তাকালে বারবার তাকাতে ইচ্ছে হয়, বহু সময়জুড়ে কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে হয়। 


একদিন তো আমি বলেই বসেছিলাম, আপা আমিতো আপনার দু'চোখের প্রেমে পরে যাচ্ছি। আপা হেসে দিলেন। সেদিনই প্রথম খেয়াল করলাম, হাসলে আপাকে দারুণ মিষ্টি দেখায়। গালে খুব হালকা করে টোল পরে যে ? সে কারণেই বোধহয়। 

এভাবে যাওয়া-আসার পথে টুকটাক কথা হতে হতেই আপার সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে।

আপার গায়ের রঙ ছিলো একটু চাপা, আর সে কারণেই যেনো আপাকে আরও বেশি মায়াবী দেখাতো। আর সে কারণেই হয়ত আপার জীবনে নেমে এসেছিলো ঘোর অনামিশা।

আপা পড়াশুনোয় তেমন একটা ভালো ছিলেন কিনা জানি না, তবে পড়তে তিনি মোটেও ভালোবাসতেন না, আর তার প্রমাণ আপার সব কথাতেই বেশ পাওয়া যেতো। বরাবরই তার ইচ্ছে ছিলো বিয়ে করে সংসারী হবেন। খুব গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন ছিলো আপার। তাই অনার্সে ভর্তি হতে না হতেই আপার সম্মতিতে তার পরিবারের লোকজন আপার বিয়ে ঠিক করেন। একরকম হুট করেই বলা চলে। 

অন্য আর আটদশটা দিনের মতনই আপার বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, অকস্মাৎ শুনতে পেলাম কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকছে।

ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মোনালিসা আপা ডাকছে। দু'সিঁড়ি করে ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে একদম শূন্যে ভেসে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছিলেন আপা, অনেকটা হরিণ শাবকের মতন ! 

এত্ত খুশি ? 

আর বলিস না, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার ! বলতো এত অল্প বয়সে বিয়ে করাটা কি ঠিক হচ্ছে ? 

বলেই লজ্জায় মুখ ঠেকে ফেললেন দু'হাত দিয়ে। 

বিতিব্যস্ত এবং অত্যন্ত বিরক্ত আমি বলেই বসলাম, তুমিইতো চেয়েছো বিয়ে করতে আপা, এখন আবার ওতো ন্যাকামি কেনো! 

যাহ !  তুইও, মুখে কিছু আটকায় না তোর। 

আজকে হলুদ, কাল বিশ্রাম, পরশু বিয়ে। আসিস কিন্তু, না আসলে আর কোনোদিন কথা বলবো না তোর সাথে। 

এই বলেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আপা আবারও সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠে গেলেন, এবার আপাকে লাগছিলো অনেকটা টোট্যাং এর মতন।



পারিবারিক একটা কারণে বেশ কিছুদিন আমাদের গ্রামের বাড়িতে থাকতে হয়েছিলো, তাই আপার বিয়েতে আর আমার আসা হয়ে ওঠেনি। এরপর যখন বাসায় ফিরলাম, আপাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিদিন মুখ তুলে চাইতাম, এই বুঝি আপা ডেকে উঠবেন, এই আশায় ! 

এরপর বছর গড়িয়ে যায়, আমিও আপার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। নিজের চিরাচরিত কাজ-কর্ম নিয়েই ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছি। 

হঠাৎ একদিন শুনলাম মা'কে পাশের বাসার আন্টি বলছেন, 'জানেন আপা, ওই বাসার মেয়েটাকে জামাইবাড়ি থেকে পিটায় হাসপাতালে পাঠায়ছে।' 

কে ? 

আরেহ হলুদ বাড়িটার, বাড়িওয়ালার মেয়েটা, মোনালিসা।

আমার বুকটা ধুক করে উঠলো। 

আন্টি এটা কি বললেন ! 

এত মিষ্টি একটা মেয়ে মোনালিসা আপা, কেনইবা তাকে মারধর করবে !  আপা তো আজীবন শুধু একটু গুছিয়ে সংসারই করতে চেয়েছেন। 

তবে কেনো....  ?

এই কেনোর উত্তর জানার জন্যে মাকে প্রশ্ন করার মতন সাহস আমার ছিলো না। 

অগত্যা আড়ি পাতাই ছিলো আপা সম্পর্কে জানার আমার একমাত্র উপায়।

আন্টি বলছিলেন, 'মেয়েটা কালো বলে ওরা অনেক পণ চেয়েছিলো, মোনালিসার বাবার তো টাকার অভাব নেই, তাদের চাওয়া সবই পূরণ করলো, কিন্তু ওদেরতো চাওয়াই শেষ হয় না !

এদিকে মোনালিসাকেও উঠতে-বসতে শুধু অপমান করতো । 

মোনালিসা আর সইলো না, একদিন প্রতিবাদ করে বসলো, অমনি ছেলে আর ছেলের মা ওর গায়ে হাত তুলে ফেললো। 

শুনলাম খাটের স্ট্যান্ড দিয়ে বেকায়দায় মারাতে মেয়েটার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। 

বাবা-ভাইয়েরা খুব চেষ্টা করছে মেয়েটাকে কোনোরকমে সুস্থ করে জামাইয়ের কাছে পাঠাতে। লোকে কি বলবে আপা বলেন ? 

আর মেয়েটা বলি বালাইষাট। 

মেয়েমানুষের অতো কথা বলতে আছে ? '

আমার মা কেবল বললেন, 'হুম।'

কি জানি তখন কি যেনো একটা ভাবছিলেন মা ! 

এরপর থেকেই দেখলাম আমার এবং তাঁর অন্যান্য মেয়েদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে মা আরও বেশি কঠোর হয়ে গেলেন।

তার কিছুদিন পরে আন্টির কাছ থেকেই জানতে পারলাম আপুর ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপু আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না, এমন কি মাও হতে পারবেন না; তাই আপুর স্বামী আপুকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। 

এদিকে আপুর পরিবারও খুব একটা আগ্রহী নয় আপুকে ফিরিয়ে নিতে, শুধুমাত্র আপুর মেঝো ভাইটি ছাড়া। 

এ অবস্থায় কোথায় যাবেন আপু ! 

মোনালিসা আপুর গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। শেষটা ঠিক কেমন হত ? 

আপু হুইল চেয়ারে বসে নিজের পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন অন্যের গলগ্রহ হয়ে আর গঞ্জনা শুনে ! আর একসময় কষ্ট সইতে না পেরে আপু বিষ খেয়ে মারা গেলেন। 

কেউ জানতে পারলো না এই আবদ্ধ শরীরটার ভেতরের প্রাঞ্জল আত্মাটার কথা ! 

আর আটদশজন মেয়ের জীবনে ঠিক এমনটা ঘটলেও মোনালিসা আপু এমন এক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন যা পাশের বাসার আন্টিকেও বাধ্য করলো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে। 

আন্টিতো এখন এলাকায় যাকেই পাচ্ছন বলে বেড়াচ্ছেন, 'কি করো তোমরা ?  মোনালিসার মত হতে পারো না ? কি জেদি মেয়েরে বাবা!' 

মেঝো ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে মোনালিসা আপা পড়াশুনাটা ঠিকঠাক সম্পন্ন করে নেন, একেবারে মাস্টার্স পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেন। সাথে নিজের হাতে করা রান্না নিয়ে একটা অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন, তার সাথে যোগ হয় হাতের কাজের বাহারি জামা-ব্যাগও। 

শুনেছি আপা এখন আর তার পরিবারের সাথে থাকেন না। নিজেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি। একইসাথে বেশক'জন এতিমের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে পুরোদস্তুর মা হয়ে উঠেছেন আপা।

ভাবছি, একদিন দেখতে যেতে হবে আপাকে। কি জানি কথা বলে কি না! 

যেই না জেদ আপার, সেই যে বললো, বিয়েতে না আসলে তোর সাথে কথা নেই; আজ কত বছর কেটে গেলো!  

আপা ঠিকই আপার কথা রাখলো ।।  

একাকিত্ব

সে আছে; তার হাসি আছে, অশ্রু টলমল জোড়া চোখ আছে, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস আছে, নৈসর্গিক ভালোবাসাও আছে । 


সে ছিল; তার অভিমান ছিল, সিক্ত চুলের ঘ্রাণ ছিল; যা আবিষ্ট করে রাখত এক ভয়ংকর মত্ততায় !

হঠাত্‍ সে নেই; 

তার চঞ্চল চরণের পদাঙ্ক নেই, 

মৃদু ছন্দ নেই, শ্বসন-নিশ্বসনের তপ্ত ব্যজন নেই,

আলিঙ্গনের উষ্ণতা নেই । 

কিন্তু তবুও সে আছে, তার সব আছে; 

কেবল তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। 

হাত বাড়ালেই সে মরীচিকা, সে কেবলই এক আকাশ দু:খ; 

সে হলো শুন্যতা । 

তার স্মৃতিরা হানা দেয় সময়-অসময়ে আর কাঁদায় অঝরে । 


সে নেই; কখনোই ছিল না। 

তার হাসি কেমন জানা নেই, 

তার স্বরের সুরটাও অজানা,

জানা নেই তার আবক্ষের গড়ন-অক্ষের শীতল দৃষ্টির প্রগাঢ়তা ; কিছুই জানা নেই । 

মাঝে মাঝেই কল্পনায় তার আবির্ভাব হয়, আবার চলেও যায় । তাকে ভাবতে ভালো লাগে,

কিন্তু তার জন্য কষ্ট হয়না কখনই; তার কোন স্মৃতি নেই ,

এটা একাকিত্ব ।


একাকিত্ব সহনীয় কিন্তু শুন্যতা অসহনীয়। 

যা অদেখা-অশ্রুত-অজানা; তা ভাবা যায়, ভাবতে ভালোও লাগে। 

অথচ যা একবার জানা হয়ে গেছে-পাওয়া হয়ে গেছে; তা হঠাত্‍ হারিয়ে গেলে সৃষ্টি হয় শুন্যতার, যার অনুভূতি সত্যিই ভীষণ ভয়ংকর । 


তাই প্রকৃতির কাছে চাওয়া; যা দাওনি, তা কখনো দিও না; 

আর যা দিয়েছো, তা কখনো ছিনিয়ে নিওনা  ।।

Saturday, June 18, 2022

প্রিয় শৈশব

প্রিয় শৈশব,

তুমি ভালো থেকো । তোমার আধিপত্য যখন আমার জীবন জুড়ে; আমি তোমাকে বুঝিনি, তুমি আমাকে ক্ষমা ক'রো ।


বিধি-নিষেধের বেড়াজালে হাঁপিয়ে ওঠা আমি কত-শত শাপ-শাপান্ত করেছি তোমাকে, মুহূর্তে সহস্রবার তোমাকে অতীত করতে চেয়েছি ।

অথচ সেই তুমিই ছিলে সকল বাঁধা এক লহমায় ডিঙোনোর আমার একমাত্র শক্তি ।

জীবনের পথে আনকোরা পথচারী আমি সেদিন উপলদ্ধি করতে পারিনি তোমার অদম্য সামর্থ্য, অপচিত হয়েছো তুমি আমার হেলা-ফেলায় । 


আজ হয়ত বিধি-নিষেধের শৃঙ্খলে আমি বন্দি নই, কিন্তু সেই "বিধি-নিষেধ" আজ আমার জীবনে এসেছে "নীতি-নিয়ম-নৈতিকতা" হয়ে । আজ আর তুমি নেই, বাঁধা ডিঙ্গোনোর অদম্য সাহসও আমার নেই; তাই আজ আমাকে অবদমিত হতে হয়েছে, আজ আমিই হয়েছি অসার-অলীক সেইসব নীতি-নৈতিকতার একান্ত অনুগত একজন । 


প্রিয় শৈশব; 

আমার জীবনকে তুমি আধিদৈবিক সব ক্ষণে পরিপূর্ণ করে তুলেছিলে, প্রণয়াবেগের প্রথম ক্ষণের শ্রেষ্ঠ অনুভূতিতে হৃষ্ট করেছিলে আমার হৃদয়াকাশ, তোমার হৃষিত প্রশ্রয়ে দুরন্ত হয়ে ওঠা আমি পদদলিত করেছি সবুজ মাঠ-পড়ন্ত বিকেল-নীলাকাশ-কাশফুল-নদীর তীর-ছেড়াপালের নৌকো-বর্ষার বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, আরো আরও কতো কি !

কি সখ্যতাই না গড়ে দিয়েছিলে তাদের সাথে তুমি আমার !


আজ তুমি সত্যিই অতীত হয়েছো আমার জীবনে, সাথে নিয়ে গেছো আমার জীবনে তোমার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহারগুলো ।


তবুও তুমি ভালো থেকো ।

ভালো থেকো,

প্রিয় শৈশব আমার ।


নিজ সন্তানের দায়িত্ব নিজ মাতার উপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক ?

আমার সামনের সিটে বসা আপুটি সম্ভবত সদ্য কোনো চাকুরিতে নিয়োগ পেয়েছেন, পোস্টিং চট্টগ্রামের বাহিরে কোনো এক গ্রামে বা মফস্বলে। 

নিশ্চয় সরকারি চাকুরি, না হলে অমন সাধ করে কে'ই বা গ্রামগঞ্জে যেতে চান ! 

তারই পাশে আরেকজন আপু, তারা দু'জন সম্ভবত বান্ধুবী সম্পর্কীয়। তাদের অতি উচ্চস্বরের আলাপন অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করার দরুন আমি অত্যন্ত অনাবশ্যকবশত তাদের আলাচারিতা শুনতে পাই এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হই। 

" তোর পোস্টিং তো *** জায়গায়, ওখানে তোর মেয়েকে নিয়ে যাবি কিভাবে?  ভালো স্কুলও নাই ! "

" নিবো নাতো ** কে  ! "

'' তাহলে ? " (অবাক হয়ে বান্ধুবি প্রশ্ন করলো) 

'' আম্মার কাছে থাকবে! '' (যেনো অতি সাধারণ একটা ব্যাপার) 

(এবার বান্ধুবিটি অতি আস্ফালনের সাথে নিজের কষ্টের ঝুলি মেলে বলা শুরু করলেন)

" তোর আম্মাতো অনেক ভালো, আমার আম্মাতো কোনোরকম বিয়ে দিয়েই শেষ, নিজে এখন ঘুরে বেড়ায়, কিছুদিন বড় ভাইয়ের কাছে আমেরিকা যায়, আবার দেশে এসে ছোটো ভাইয়ের সাথে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায় বড় ভাইয়ের কাছে। "

এতটুকু শোনার পর আমি নিজেই উপযাচক হয়ে সিট পাল্টে দূরে গিয়ে বসলাম, কেনো যেনো তাদের এই আলাপন আর শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। 

প্রসঙ্গত; আমাদের দেশের নারীরা এখন শিক্ষিত হচ্ছেন, ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার- উকিল - পুলিশ - ম্যাজিস্ট্রেট - সাংবাদিক - পাইলট - ব্যাংকার; এমন সব সম্মানজনক পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছেন, অর্থ উপার্জন করছেন। 

বেশ ভালো। 

কিন্তু নিজের মা'কে তাঁর সত্যিকারের 'দেয়টুকুন' দিতে পারছেন তো ? 

সেই মা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি নিজে শিক্ষিত হতে পারেননি বলে নানান গঞ্জনার শিকার হয়েছেন বিধায় নিজের মেয়েকে মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানটুকু আদায় করে দেওয়ার জন্যে নিজের কিশোরীবেলা-তরুণীকালের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন। 

এদেশে একটা ছেলে যখন ডাক্তার হয়, ব্যাংকার হয়, বড় চাকুরে হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই 'ছেলের' মায়ের চাকুরিজীবী ছেলের সন্তানদের নিয়ে অতো ভাবতে হয় না !  

বরঞ্চ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি বেশ আরাম আয়েশেই জীবন পার করে দেন।

কিন্তু একজন নারী যখন ব্যস্ত কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ 'সেক্রিফাইস'টি করতে হয় 'মেয়ের মা'কেই । 

পৌঢ়কালেও তাঁকে নাতি-নাতনীদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয়। 

আর এখানেই সমাজে 'ছেলের মা' আর 'মেয়ের মা' এর মধ্যে বিস্তর তফাৎ লক্ষ্য করা যায় । 

আমাদের কাছে মা মানেই যেনো নিজের 'পিতার কেনা আজীবনের ভোগের সম্পত্তি', শুনতে কটু হলেও ক্ষেত্রবিশেষে এটাই সত্য। সন্তানের জন্যে আমৃত্যু নিজেকে বিসর্জন করে যাওয়াই যেনো মানুষটার জীবতকালের একমাত্র লক্ষ্য !  আকারে-প্রকারে-অবস্থায় সময়ের সাথে সাথে ছেলে-মেয়ে উভয়েই আমরা পাল্টালেও ভাবনার জায়গায়টায় কোথায় যেনো বুনোই থেকে গেলাম !

তা না হলে, সেই দুজন আপুর একজনের কথা ধরেই যদি বলি; নিজ মায়ের স্বাধীন-সুখী জীবন নিয়ে তিনি এতটাই অসন্তুষ্ট যে তার মা কেনো তার বান্ধুবির মায়ের মতন নিজের জীবনের শেষসময়টুকুও মেয়ের সন্তানদের জন্যে উদ্বাসন করছে না, সেই আস্ফালনে আপুটি মুখিয়ে উঠেছেন !  

তাহলে সমাধানটা কি ?

সমাধান খুবই সহজ। 

একজন চাকুরিজীবী নারীর সন্তানের প্রতি সেই নারীর মায়ের যে পরিমাণ দায়িত্ব, তার চাইতেও দ্বিগুণ দায়িত্ব বর্তায় সেই নারীর শ্বাশুড়ির উপর। কেননা, আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার দরুণ একজন পেশাজীবি নারীর আয়ের বেশিরভাগংশই ভোগ করেন তার স্বামী ও স্বামীর পরিবার (ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হতে পারে)।

এছাড়াও সন্তানেরা যেহেতু পিতার পারিবারিক পরিচয়েই বেড়ে ওঠে এবং সে পরিচয়কেই ধারণ করে, সে মোতাবেকও সন্তানের প্রতি সন্তানের পিতার পরিবারের দায়িত্বই বেশি বলা চলে। তবে সেক্ষেত্রেও ছেলের মা কিংবা পরিবার দায়িত্ব নিতে কতটুকু উৎসুক, সেটিও দেখবার বিষয়। 

তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সেই কর্মজীবী নারী এবং তার স্বামীর। বিয়ের আগেই তাদের উচিত সন্তানের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ও সমীচীন সিদ্ধান্ত নেওয়া।

'মেয়ের মা' বয়োজ্যেষ্ঠ বা অসুস্থ হয়েও নিজে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিতে চাইলেও তাঁর কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এদিকে,  তিনি সুস্থ-সবল-সামর্থ্যবান হয়েও যদি মেয়ের সন্তানদের দায়িত্ব নিতে না চান তবে তাঁকে 'চক্ষু লজ্জায় ফেলে', 'ইমোশন্যাল ব্লেকমেল' করে তাঁর কাঁধে এমন কর্তব্যবন্ধন আরোপ করাও অনুচিত।


তাই একজন কর্মজীবী নারীর মা'এর উপরই সবসময় সেই নারীর সন্তানদের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি দায়িত্ব দিতেই হয় তবে তার সাথে সেই নারীর আয়ের বেশিরভাগ অংশও দিতে হবে 'মেয়ের মা'কে'ই । আর এ ব্যাপারে একজন কর্মজীবী নারীর স্বামীকেও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী হতে হবে। 


পুণশ্চঃ ; ভাইয়ারা এবং ভাইয়াদের পরিবার, আপনারা একজন নারীকে 'চাকুরি করতে দিয়ে' মোটেও মহৎ কোনো কাজ করে ফেলছেন না। নিজের পছন্দমতন জীবন বেছে নেয়া মানুষ হিসেবে একজন নারীর জন্মগত অধিকার। 

তাই 'গাছেরও খাবেন, তলারও কুঁড়োবেন' সেই পুরাতন ধ্যানধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে নিজের বিবেককে জাগিয়ে তুলে তবেই সিদ্ধান্ত নিন ।।

সত্যিকারের বাবা

বৃষ্টি নেই কিন্তু দমকা বাতাসে বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থা !  আমি দাঁড়িয়ে আছি চৌরাস্তার মোড়ে, আশেপাশে আশ্রয় নেবার মতন দোকান কিংবা 'অভিভাবক শ্রেণির গাছ' কিছুই নেই ! 

শুধু আছেন এক ষাটোর্ধ্ব রিক্সাচালক চাচাজান আর তাঁর রিক্সা। চাচাজান বারবার অনুরোধ করছেন, 'রিক্সায় চাপেন আম্মা, আপনারে বাসের ধারে দিয়া আসি'। 

আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিলো, এরকম একটা আবহওয়ায় এই বয়সী একজন মানুষকে এভাবে কষ্ট দিবো !  অগত্যা আর কোনো উপায় না দেখে আর চাচার অত্যন্ত স্নেহমিশ্রিত অনুরোধের কাছে হার মেনে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলাম। 

এদিকে; কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা আবেগবশত হয়ে চাচাকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, 'আপনার ছেলে মেয়ে নাই ?  এই বয়সে এত কষ্ট করে রিক্সা চালান ?' 

চাচা উত্তরহীন, নিশ্চুপ।

আমি একটু থেমে আবারও শুধালাম, 'আপনার ছেলেমেয়েরা দেখেনা আপনারে?' 

চাচা এবারও উত্তরহীন। তাই আমিও চুপ হয়ে গেলাম, মনে মনে খারাপ লাগছিলো, এই ভেবে যে; মানুষটার স্নেহের সুযোগ নিয়ে অনধিকারচর্চা করে বসলাম।

বেশকিছুক্ষণ পরে, যখন আবহওয়া কিছুটা অনুকূলে এলো, চাচা নিজ থেকেই কথা বলা শুরু করলেন।

যার সারসংক্ষেপ এমন, যৌবনে তিনি বিয়ের পর বিয়ে করে গেছেন, পরকীয়াও করেছেন। এদিকে প্রথম বউ, দ্বিতীয় বউ; এমনকি শেষ বউটার সন্তানের দায়িত্বও তিনি নেন নাই (বউয়ের সন্তান, নিজের নয় কিন্তু)। এদিকে যাদের সাথে পরকীয়া করেছেন তাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ামাত্র তিনি কেটে পরেছেন, পরে আর খোঁজ নেন নাই। 

টাকা উপার্জন করে জুয়া খেলেছেন, বিড়ি টেনেছেন; মোদ্দাকথা জীবনকে 'উপভোগ' করেছেন। আর তার সেই কু-কৃতকর্মের (তার ভাষায়) কুফল তাকে এই বয়সে এসে ভোগাচ্ছে। 

তার তিন স্ত্রীর ঘরে মোট ক'জন সন্তান তিনি জন্ম দিয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট হিসেবও তার নেই ! তবে প্রথম স্ত্রীর বড় দুই ছেলে সন্তান নাকি তার নেউটা ছিলো ভীষণ। বাবা বাবা করে তার জন্যে পাগল হয়ে থাকতো ! তিনিই তাদের উপেক্ষা করেছেন, অবহেলা করেছেন।

ঘটনা শেষে তিনি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

আজ তার অপরাধবোধ হয় ভীষণ ! যদি যৌবনে জীবনের লাগাম টেনে ধরতেন তাহলে এই বয়সে এসে তিনি নিশ্চয় একটা সম্মানের জীবন পেতেন।

চাচার কপোল বেয়ে অশ্রু ঝরে। 

আশ্চর্যান্বিত আমি ভাবি, জীবন তাকে ভুগিয়েছে বলেই আজ তার মাঝে বোধ জেগেছে। সবার মাঝে শেষ জীবনে হলেও সত্যিই কি এমন বোধ জাগে ? 


এ সমাজে একজন নারী যখন 'মা' হোউন; তা তিনি ষোড়শী-তরুণী-যুবতী-ধনী-গরীব যাই হোউন না কেনো, নিজের সাধ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সমাজ তাকে দেবীরূপে মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত করে। আর একজন পুরুষ যখন পিতা হোউন তিনি পিতা কম পুরুষই থাকেন বেশি, আর সমাজের কাছে তাই'ই সই ! 

আর এজন্যই সম্ভবত এই সমাজের লক্ষাধিক সন্তান নিজের পিতার কাছে নিজেরই মা'কে দিনের পর দিন অপদস্ত-অবহেলিত হতে দেখে, এমনকি কেউ কেউ মার খেতে দেখেও অন্ধভাবে নিজের পিতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে ! 


এদেশের 'বাবা'রা সত্যিকারের বাবা হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা শুধুমাত্র নিজের সন্তানের চোখে 'ভালো বাবা' হওয়ার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠুন। এদেশের বাবারা 'শরীর সর্বস্ব পুরুষ' না হয়ে সত্যভানে একজন আন্তরিক বাবা হয়ে উঠুন। 

ভালোবাসি তোমায়

আমি পদ্মলতা

তীরন্দাজ,

তুমি কি ছোবে আমায় ?


আমি যে এক উদাসীন কবির কবিতা,

আমার সঙ্গে কভু হয়নি কারো সমঝোতা

হয়নি কারো মিত্রতা,

  

     আমি পাষণ্ড

     আমি বিভাচারী


সবার সঙ্গে হয়েছে যে মোর আড়ি,

নিঃস্ব এ জীবন অভিসম্পাত করে আমায়,


তাইতো ভয় হয় বলতে ;

     ভালোবাসি তোমায় ।


আমি নারী ;

রহস্যময়ী

কখনো আমি কোমল

কখনোবা মৌন,

পাহাড়ের ন্যায় 


তবুও হৃদয় আমার মমতাময়ী,

আমি জানি ভালোবাসতে,

ভালোবেসে সর্বস্ব উজাড় করে দিতে ;


তবুও কি ছোবে আমায় ?

        হে তীরন্দাজ

        অবুঝ আমি 

        ভালোবাসি তোমায় ।


মন আজ বিষন্ন,

ডুকরে কেঁদে ওঠে হৃদয়

দু'চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে,


শূন্যতা; শুধুই শূন্যতা

আজ মনের আকাশে,


হৃদয়ে চাপা কষ্ট কিংবা অভিমান,

ভুলে যেতে ইচ্ছে করে সব অপমান,


এর নামই কি ভালোবাসা !


এ যে কেবলই মরিচীকা আর মিথ্যে আশা ।।


১৩ মাঘ ১8১৭  (২০১০)

অতিপ্রাকৃত কথন

মৃত্যুর পর যে মানুষ বেঁচে ওঠেন না, তিনি আসলে কখনো বেঁচেই ছিলেন না !  

মৃত্যুর পরই সম্ভবত একজন মানুষের সত্যিকারের জীবন শুরু হয়; পরকাল নয়, পার্থিব জীবনই। খানিকটা বাতুল শোনালেও সম্ভবত এটিই অমেয় সত্য। সদ্য দেহান্তরিত মানুষটিকে নতুনভাবে চেনা যায়, এমনকি 'নতুন' তাকে খুঁজে পান তার কাছের মানুষেরাও ! 

একজন ব্যক্তি যদি তার জীবদ্দশায় খারাপ কর্ম করে বেড়ান, তা সে তিনি তার ক্ষমতাবলে তার কুকীর্তিসমূহ যতই গোপন করুন না কেনো, দেহত্যাগান্তর তার কৃত সে সকল অশিব কর্মের কথা প্রকাশ পাবেই এবং তা পরিবর্তনের কোনো সুযোগও তার থাকবে না। 

অনন্ত নিদ্রাযাপনের মুহূর্ত থেকে পরিচিত-অপরিচিত-স্বল্পপরিচিত-ঘনিষ্ট সকল লোকের স্মৃতিতে আজীবন তিনি অপকৃষ্ট ব্যক্তি হয়েই বেঁচে থাকবেন। 

অন্যদিকে, ব্যক্তি গোপনে ভালো কাজ করলেও ব্যক্তির অন্তর্ধানান্তর তা ঠিক প্রকাশ পাবে। এবং সেটিই হবে সেই মানুষটির শেষ পরিচয়।  আত্মিকভাবে পার্থিব জীবনে লোকের স্মৃতিতে তিনি চিরন্তন বেঁচে থাকবেন প্রেয় এবং প্রিয় ব্যক্তি হয়ে। 


সত্যিকারার্থে; মানুষ দেহে বাঁচে না, মানুষ বাঁচে আত্মায়। 

একজন মানুষ দেহত্যাগের পর সেই মানুষটির পরিচিত এবং তার জীবনের সাথে যুক্ত মানুষগুলো তাকে কিভাবে স্মরণ করছেন, তাকে নিয়ে ঠিক কেমন স্মৃতি রোমন্থন করছেন, লোকের স্মরণে পার্থিব জীবনে

আত্মিকভাবে আজীবন তিনি কিভাবে বেঁচে রইবেন; 

তার মাঝেই সম্ভবত একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত থাকে  ।।

প্রণয়ের দহন

প্রজ্জ্বলিত শিখা হয়ে

তুমি জ্বলছো আমার হৃদয়জুড়ে;


আমি একটা মোমবাতির মতন দিনকে দিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে গলে পড়ছি আর মিলিয়ে যাচ্ছি,

আমারই অতলে,

আমার গলে পড়া শরীর থেকে একদিন তৈরি হবে নতুন কেউ,

সেও হয়ত এমনি করে মিলিয়ে যাবে একদিন।

 

ভালোবাসার এমোনি দহন, 

যা আলো করে চারিপাশ,

শুধু দাহন করে প্রনয়িনীর হৃদয়  ।।

নারীদের জন্যে কেনো নেই নিরাপদ-স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামাগার ও প্রার্থনালয় ?

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে সদ্য পরিচিতা সহযাত্রীর সাথে মুখর আড্ডার এক পর্যায়ে আপু হঠাৎই ভীষণ কাশতে লাগলেন, সম্ভবত অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলার কারণে গলা শুকিয়ে কাশি হচ্ছিলো আপুর। 

আমি পানি এগিয়ে দিলাম,

আপু কাশতে কাশতেই নিজের হাতটি দিয়ে আলতো ঠেলে আমার পানির বোতলটি ফিরিয়ে দিলেন ! 


বহু কষ্টে কাশি থামিয়ে খুব ধীরে ঢোক গিলতে গিলতে আপু বললেন, "পিরিয়ড চলছে, পানি খাবো না, এমনিতেই ট্রেনের ওয়াশরুমের অবস্থা খারাপ, আর এই অবস্থায় এসব টয়লেট এ যাওয়ার কথাতো ভাবতেই পারি না" ! 


সত্যিই তাই নয় কি ? 

এদেশে "পাবলিক টয়লেট" রীতিমতো একটি আতঙ্কের নাম। নারীদের জন্যেতো রীতিমতো যমদূতসম ! 

তবে, তা সে যত নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর; যাই হোক না কেনো, পুরুষদের জন্যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাবলিক টয়লেটের দেখা মিললেও, এদেশে নারীদের জন্যে পথে-ঘাটে পর্যাপ্ত শৌচাগারের সুব্যবস্থা আছে কি ? 


শুধু তাই নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ার দরুণ এদেশে কিলোমিটার অন্তর অন্তত একটি মসজিদের দেখা মেলে এবং সেখানে পুরুষদের শৌচ কার্য, হাতমুখ ধোয়াসহ বিশ্রাম নেয়া ও ইবাদতের সুব্যবস্থা থাকলেও, নারীদের জন্যে তেমন কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে। 


অথচ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)- ২০১৯  সালের তথ্য অনুযায়ী; বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩৮ শতাংশ, এছাড়াও বিভিন্ন কারণে দেশের বেশিরভাগ নারীদেরই এখন দেশের নানান প্রান্তে ভ্রমণ করার প্রয়োজন হচ্ছে। 

এমনকি অনেকেরই যেকোনো প্রয়োজনে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার পরে সে শহরে আধঘন্টা অবস্থান করার স্থানটুকুও নেই !  

আবার এমন অনেক নারী আছেন, যারা সদ্য মা হয়েছেন, জীবন জীবিকার প্রয়োজনে দুধের শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে, শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হচ্ছে। এদেশে চলার পথে সন্তানকে দুগ্ধদানের নিরাপদ স্থানটুকু খুঁজে পেতেও তাদের রীতিমতো বেগ পেতে হয়। এ সকল প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় অনেক নারীই হয়ত জীবন জীবিকার পথে এগিয়ে যেতে পারেন না।

তাই নারীদের জন্যে যদি চলার পথে বিশ্রামাগারের সুবিধা থাকতো তবে সেখানে নারীরা প্রাতঃকৃত্যসহ বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পেতেন, একইসাথে নির্দিষ্ট সময়ানুযায়ী ইবাদত-প্রার্থনাও করতে পারতেন। 


ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অনেকেই সমাজে পুরুষ ও নারীর "সমঅধিকার" দাবী করেন, অথচ দৈনন্দিন চলার পথে এতটুকুন "স্বস্তি" পাওয়া থেকে যে প্রতিমুহূর্তে নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, এ নিয়ে কখনই সমঅধিকার সচেতন ব্যক্তিবর্গকে আপত্তি তুলতে বা দাবী জানাতে দেখি নি !


এদেশে নারীদের জন্যেও প্রতিকিলোমিটার অন্তর নিরাপদ-স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামাগার ও প্রার্থনালয় (যেখানে সকল ধর্মের নারীরা একই সুবিধা পাবেন) এর ব্যবস্থা করা হোউক ।

কবিতা

ভারি ভালো লাগে পাহাড়;


বাড়ি আমার সমুদ্রের কাছাকাছি

তাই ছেলেবেলা থেকে তার পাশেই আছি।


কিন্তু কখনো প্রেম হয়নি তার সাথে,


পাহাড়; দেখিনি তাকে কখনও

অথচ তাকে ভেবে ভেবেই আমার সারাটিদিন কাটে । 


একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম ছাড়ব সমুদ্দুর 

যাবো বহুদূর,

যেখানে সূর্য ঢলে পরে পাহাড়ের কোলে

আবার উদিত হয় সেই পাহাড়ের আড়াল থেকেই ।


যাওয়ার বন্দোবস্ত সব পাকাপাকি

শুধু আকাঙ্ক্ষিত দিনটির আসা বাকি।


অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে

আসল সেই দিন ।।


দু'চোখে আমার প্রেমের ঘোর,

সময় তখন খুব ভোর ।


যাত্রা হলো শুরু

বুক আমার উত্তেজনায় দুরু দুরু ।

জয় হচ্ছে আমার প্রেমের

হৃদয়ে বাজে বাঁশি শ্যামের ।


বেশ কিছুদিন কাটল আমার পাহাড়ে

মনে মানে না,

অশ্রু ঝরে লোক চক্ষুর আড়ালে ।


হৃদয়ে অনুভূত হয় হাহাকার

মন বুঝে না,

জীবনে কি যেন কি আছে বাকি পাওয়ার !


সমুখে মেলি দু'চোখ

যেখানে বিশাল আকাশ আর বিস্তৃত মাঠ

চুকে গেছে আমার প্রেমের পাঠ।


ঘোর লাগা চোখ সত্যের সন্ধান করে

মন বলে উঠে,

ভালোবাসি আমি কারে!


প্রেমের ঘোর কেটে যায় আমার;

বুঝতে পারি,

অন্তরে এতো কিসের হাহাকার।


ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই সমুদ্রের পাড়ে

যারে পর করে এসেছি জীবনের তরে।

হয়ত সেথায় আর যাওয়া হবে না,

সমুদ্রকেও যে আর ভুলে যেতে পারবো না ।


কত-শত অবহেলা তাকে করেছি,

সমুদ্রকে ছেড়ে এসেছি পাহাড়ের কাছাকাছি।

অথচ এই সহজ সত্যটিই বুঝতে পারিনি;


তাকেই ভালোবাসি  ।।


- ৮ ফাল্গুন, ১৪১৭ ।

Thursday, June 16, 2022

তুমি

বর্ষার মেঘে সন্ধ্যে নেমেছিল সেদিন,

মেঘাচ্ছাদিত আমি

আমায় বিসর্জন করেছিলাম 'বৃষ্টি বিন্দু কণায়',

তুমি ডুবেছিলে বৃষ্টিস্নাত মেয়েটির আর্দ্র চুলে, চঞ্চল চরণে, 

ছেলে মানুষী খেলায় আর তার জল-কেলীর মূর্ছনায় !


সেদিন বর্ষণের বারি ধারা ধুয়ে নিয়েছিল তোমার চোখের জল,

কিন্তু আমার হৃদয় দেখেছে তোমার হৃদয়ের রোদন,

বৃষ্টি আড়াল করতে পারে নি,

তোমার হৃদয়জাবেগ-বেদনা-চিত্তের ব্যগ্রতা  ।।

Wednesday, June 15, 2022

মায়ের চিঠি

'তোমাকে' অতিক্রম করে আমি 'আমার আমি'কে যত শতবার আলিঙ্গন করতে চেয়েছি,

ব্যর্থ হয়েছি  ।। 


আমার মাঝেই 'তুমি' বর্তমান, 

সেই তোমার অস্তিত্ব জাগানিয়া দিন থেকে তোমার রূঢ়-রুক্ষ কন্ঠ, প্রগাঢ় ভাবনা, ভাবলেশহীন দৃষ্টি, উদভ্রান্ত ভাবনার দিনগুলো পর্যন্ত, 

আমার মাঝেই 'তুমি' বর্তমান  ! 


পৃথিবীর বুকে চলতে শিখে গেছো, ভালোবাসতে শিখে গেছো;

এখন তুমি আমায় আর তোমার ভাবোনা ঠিকই,

কিন্তু না চাইলেও আমায় হৃদয় তোমায় ভাবে,

তোমার জন্যে আমার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ভাঙ্গে শত কোটিবার, 

চাইলেও আমি তোমায় 'অন্য মানুষ' ভাবতে পারি না  ! 

আমার হাত-পা-মুখ-মাথা আর হৃদয়ের মতন, 

তুমিও যেনো আমার দেহেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

তাই তুমি আমায় কারণ-অকারণে ঘৃণা করলেও, 

আমি তোমায় ভালো না বেসে পারি না ! 

নিজের অঙ্গে পচন ধরলেও, 

দিনশেষে যে তা নিজেরই থাকে ! 


প্রিয় সন্তান;

আমি তোমার কাছে এখন এক অন্য মানুষ,

কিন্তু তুমি আমার জীবনে আজীবনই বর্তমান  ।।

মাত্র ইহাই

বিশালাকার মেঘগুলো? 

দলে দলে ছুটে চলেছে যারা,

হঠাৎ ঘর্ষণে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে মৃত্তিকায়? 

আর বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ? 

স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন; 

একা, ভীষণ একা ! 


এ জীবনে কে একা নয় ? 

এ মহাকালে বিচ্ছিন্ন নয় কে ? 

প্রেম-ভালোবাসা-মায়া-মমতা; 

সবই চোখের ভ্রম বা মনের ভ্রান্ত তৃপ্তি নয় কি ? 


পাশ বালিকে স্বামী নামক প্রেমিক পুরুষ আর নারীটি,

সদ্য রতিক্রিয়া শেষে তৃপ্ত দুটো তণু

তৃপ্ত কি তাদের হৃদয়? 

দুজনেই কি ভাবছে এখন দুজনকে নিয়ে? 

নাকি অন্যকিছু? 

কিংবা অন্য কাউকে ।

সেই অন্য কেউ একজনও কি পূর্ণ করতে পেরেছে তার চিত্তকে ? 

তারাও কি একা নয় ! 


পাঁচ-সাতজন নাড়ি ছেঁড়া ধনের যিনি গর্ভধারিণী,

একজীবনের সবচাইতে নিরত-অনবসরজন,

কর্মশীলা গৃহিণী-ব্যাপৃত দয়িতা যিনি;

জীবন শেষে তিনিও যে ভীষণ একলা হয়ে রন ।


দিনোবসানে-জীবনের প্রান্তে;

সকলেই স্বন্তন্ত্র-সকলেই বিচ্ছিন্ন,

একা, আমরা সকলেই ভীষণ একা ! 


আলোর অভ্যাগমনে যে 

নিজের ছায়ারও অন্তর্ধানিত হয়,

এই জগতে কেই বা কার আর আপন হয়ে রয় ! 

তাই একা, 

আমরা সকলেই যে ভীষণ একা  ।।



মায়ের মানসের অনাময

ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দ...