আমার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নী দারুণ চঞ্চল, প্রাণোচ্ছলও ভীষণ। ইদানীং দেখছি সে নতুন একটা বিষয় শিখেছে।
যখন তাকে কোনোকিছু করতে নিষেধ করা হয়, বা কোনো কিছু করতে বলা হয়, কিংবা কোনো কিছু হয়ত তার মন মতন ঘটছে না, কিন্তু সে ঘটাতে চাচ্ছে; তখনই সে "ধর্ম" বিষয়টাকে নিয়ে এসে তার কার্যসিদ্ধির চেষ্টা করে৷ এই যেমন সে তার মায়ের ব্যাগ খুলে ব্যাগ থেকে তার মায়ের মোবাইল ফোন নিতে যাচ্ছিলো, ওমনি আমি বিষয়টা দেখামাত্রই তাকে বললাম, "অন্যকে না বলে অন্যের জিনিস ধরাতো খারাপই, তার উপর তুমি মোবাইল ফোন ধরছো, এটাতো আরও খারাপ।"
উত্তরে সে আমাকে বললো, "মায়ের মোবাইল ধরা সুন্নত।"
ঠিক এরকমই, 'চকলেট খাওয়া সুন্নত, দুপুরে ঘুমানো গুণাহ, রাতে ভাত না খেয়ে পিৎজা খাওয়া ফরয, ছোটো বাচ্চাদের মোবাইলে গেম খেলতে দেওয়া ফরয'; এরকম নিজের সুবিধামতন মনগড়া সুন্নত আর ফরয সে দিন দিন বানিয়েই চলেছে !
এই বিষয়টা তার মধ্যে কেনো গড়ে উঠেছে ?
কারণ তার আরবী শিক্ষক তাকে কোনোকিছু শেখানোর ক্ষেত্রেই বলেন, এমুক করা গুণাহ, তমুক করা সওয়াব। বেশি দুষ্টামি করলে বলেন, না পড়ে দুষ্টামি করা গুণাহ। এ কারণেই তার মনে হয়েছে এ জগতে সবকিছুই কেবল গুণাহ-সওয়াব আর পাপ-পুণ্যের দোহাই দিয়ে খুব সহজেই আদায় করা যায়।
বাস্তবিক, আমরা প্রায় সময়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে খারাপ কোনো বিষয় থেকে আমাদের শিশুদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করি। যেহেতু এই পন্থা সংক্ষিপ্ত আর সহজ, এজন্য বরাবরই আমরা এই পথটাকেই বেছে নেই। এটা করলে গুণাহ হবে, ওটা করলে পাপ হবে, সেটা করলে পুণ্য হবে; এতটুকুন শিক্ষা দিয়েই আমরা রীতিমতন হাত ধুয়ে ফেলি।
এইতো সেদিন একটা সাত বছর বয়সী শিশুকে দেখছিলাম স্টিলের একটা গ্লাস বা এরকম কিছু একটা দিয়ে ফ্লোরে আঘাত করে খুব জোরে জোরে শব্দ করছিলো। শিশুটির মা এই বলে তাকে বারবার সতর্ক করছিলেন, এরকম বিচ্ছিরি শব্দ করো না আল্লাহ গুণাহ দিবেন। শিশুটি চারপাশে তাকালো, আবার শব্দ করতে লাগলো ! মা আবারও একই কথা বলে শিশুটিকে সতর্ক করলেন আর এরপরে পিঠে দুচার ঘা দিয়ে বসলেন।
অথচ মা যদি একটু ধৈর্য্য ধারণ করে শিশুটিকে ঠিক এভাবে বুঝাতেন, বাসায় অন্য মানুষেরা আছে, তার অসুস্থ দীদা আছেন, সে এই শব্দ করাতে দীদার ঘুমুতে, বিশ্রাম নিতে কষ্ট হচ্ছে, আর এভাবে মানুষকে কষ্ট দিলে সৃষ্টিকর্তাও বিমুখ হতে পারেন। তবে নিশ্চয় শিশুটি বুঝতো, এবং এই শিক্ষা ভবিষ্যতে তাকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করতো। এই ছোট্ট একটা শিশু গুনাহ-সওয়াব কিংবা পাপ-পুণ্যের কি'ইবা বুঝবে, কতটুকুনই আর বুঝবে ! অথচ মা ধরেই নিয়েছেন পাপ-পুণ্যের ভয় কিংবা প্রলোভন দেখালেই তার অবুঝ সন্তানটি তার কথা শুনবেই !
এভাবেই অনেকটা আধেক আর একরকম ভ্রান্ত বিধিনিষেধের বেড়াজালে বেড়ে উঠে আমরা অনেকেই হয় অত্যন্ত অবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠি, কিংবা পরিণত বয়সে ভন্ড হয়ে উঠি। নিজেদের মনগড়া পাপ-পুণ্য আর গুণাহ-সওয়াবের তালিকা বানিয়ে সমাজ থেকে নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধাটুকুন আদায় করি, অন্যকে শোষণ ও দাবিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করি। যে ধর্মের সাথে মানবিকতা, ক্ষেত্রবিশেষে সত্যিকারের ধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্কই থাকে না !

No comments:
Post a Comment