Tuesday, July 19, 2022

দাম্পত্য জীবনের ত্যাগের প্রতি কেনো আমরা উদাসীন !

 নারীদের ক্ষেত্রে হরহামেশা এমনটা দেখা যায় না বললেই চলে।

তবে ক্ষেত্রবিশেষে অনেকসময়ই দেখা যায়, একজন স্ত্রী তার স্বেচ্ছাচারিতার বলে একসময় তার স্বামীকে তার নিজের পরিবার ছাড়তে বাধ্য করেন, নিজের অস্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে স্বামী ব্যক্তিটিকে বাধ্য করেন 'মুখে রক্ত তুলে' আয় করতে, আর সব আদায় করা হয়ে গেলে নতুন স্বপ্নের খোঁজে নতুন কারো সাথে নতুন কোনো জীবনে পাড়ি জমান !

এদিকে, পুরুষেরা অল্প বয়সে তার সঙ্গিনীটির প্রেমে পরেন, পরবর্তীতে তাকে স্ত্রী করে ঘরে তুলে সেই ঘরশুদ্ধ পরিবার-পরিজন-আত্নীয়-অনাত্মীয়, এবং সকল দায়-দায়িত্ব স্ত্রীটির দু'কাঁধে চাপিয়ে দেন। "এই'ই তো ভালোবাসা" ভেবে স্ত্রী বেচারি মুখ বুজে সব দায়িত্ব পালন করতে করতে একসময় নিজের যত্ন নিতেই ভুলে যান! আর তখনই স্বামী ব্যক্তিটির মনে হয় এই স্ত্রী তো তার সাথে একেবারেই বেমানান ! এক সময়কার সুদর্শনা ও মেধাবী একজন নারীকে যে আখমাড়াই এর মতন নিংড়ে নিংড়ে তার সবটুকুন শুষে নেওয়া হয়েছে, স্বামী ভদ্রলোকটির ঘূর্ণাক্ষরেও তা মনে পরে না ! তখন তিনি বিতিব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে পরেন নতুন সঙ্গিনীর সন্ধানে। হয় বর্তমানকে ছেড়ে ভবিষ্যৎকে বিয়ে করে নেন, আর খুব 'দুর্নীতিগ্রস্ত' হলে বর্তমানকে ব্যবহার করে নিজের সামাজিক মর্যাদাকে সাম্যাবস্থায় রেখে ভবিষ্যৎ এর সাথে 'কোয়ালিটি' সময় কাটিয়ে বেড়ান।


ছবি: ইন্টারনেট

বলা চলে; যারা ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তারা প্রতিটা মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কারণ সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রাণ দিয়েছেন, রিজিক দিয়েছেন। অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিতে যা কিছু অন্যায় তা থেকে বিরত থাকেন ওই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই। একইসাথে বাবা-মা পছন্দ করেন না, এমনকিছু করতেও আমরা নারাজ, প্রতিমুহূর্তে বাবা-মায়ের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ বাবা বুকের রক্ত মুখে তুলে আমাদের মানুষ করেছেন, মা আমাদের জন্যে নিজের এক সময়কার সব শখ-আহলাদ ত্যাগ করেছেন।

অথচ এই আমরাই নিজের স্বামী কিংবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে এমনটা ভাববার ভাবনাটুকুনও ভাবি না। বাবা যেমন নিজের আরাম-আয়েশ শিকেয় তুলে সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবেন, স্বামীরাও কি একইভাবে স্ত্রীদের খেয়াল রাখেন না? (ব্যতিক্রম তো আছেই)স্ত্রীর শখের শাড়িটি কিনে দেওয়ার জন্যে স্বামী ভদ্রলোকটি হয়ত অনেকসময়ই ইদ বা পূজোয় নিজের পছন্দের কাপড়টি কেনেন না! অনেকেই আবার অসুখের দিনগুলোতে রাত জেগে স্ত্রীর সেবা করেন। অন্যদিকে, নিঃসন্দেহে বলা যায় স্ত্রীরা একেবারে নিজেদের সবটুকুন দিয়ে স্বামী ও তার পরিবারকে আগলে রাখেন। অবলীলায় নিজের ছোটো থেকে বড় এমন হাজারো ইচ্ছের অপমৃত্যু ঘটিয়ে দেন হাসিমুখেই !

যদি সৃষ্টিকর্তার দানের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতাবোধ করি, বাবা-মা-ভাই-বোনের ত্যাগের বীপরিতে আমরা কৃতজ্ঞতাবোধ করি; তবে যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের অতীত না জেনে, ভূত-ভবিষ্যৎ না ভেবেই নিজের জীবনটাকে মানুষটার জীবনটার সাথে জড়িয়ে নিলো, কোনোরকম কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও কেবল আত্মিক বন্ধনের নিমিত্তে একে অন্যের জন্যে ওমন বড় বড় বলিদান করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো; সেই সম্পর্ক কি এত ঠুনকো হতে পারে ? সেই সম্পর্ককে যেনো স্রেফ একটা 'অভিলাষ' বলেই চালিয়ে দেওয়া যায়। যখন ইচ্ছে হয় মনের দোহাই দিয়ে একে অন্যকে ছেড়ে চলে যাওয়া যায় ! বেশিভাগ সময়ই চলে যাওয়া মানুষটা যাবার বেলায় রেখে যাওয়া মানুষটার দিকে ফিরেও তাকান না !

মানুষের মনতো? ঋতুর চাইতেও দ্রুত পালটায়। তা সে হতেই পারে !

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাবা-মা-পরিবার ও রক্তের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতাবোধ-ত্যাগ এই অনুভূতিগুলো যদি আমাদের এত ভাবায়, তবে স্বামী কিংবা স্ত্রীর ত্যাগের প্রতি কেনো আমরা এত উদাসীন। কেনো সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'কৃতজ্ঞতা' নামক বোধটি আমাদের মাঝে জেগে উঠে না ! কেনো সেই অঙ্গীকারকে সহজেই অস্বীকার করার প্রচলনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমরা !

কেনো অধুনাকালে একে অন্যের জন্যে করা ত্যাগের দিকে তাকানোর চাইতে একে অন্যকে 'ত্যাগ' করার ক্ষেত্রেই আমরা অতি উৎসাহী হয়ে উঠছি ?

Like
Comment
Share

Saturday, July 16, 2022

ধর্মের দোহাই নয়, বিবেক বিবেচনায় শিশুর মাঝে জাগিয়ে তুলতে হবে মানবিকতা

আমার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নী দারুণ চঞ্চল, প্রাণোচ্ছলও ভীষণ। ইদানীং দেখছি সে নতুন একটা বিষয় শিখেছে। 

যখন তাকে কোনোকিছু করতে নিষেধ করা হয়, বা কোনো কিছু করতে বলা হয়, কিংবা কোনো কিছু হয়ত তার মন মতন ঘটছে না, কিন্তু সে ঘটাতে চাচ্ছে; তখনই সে "ধর্ম" বিষয়টাকে নিয়ে এসে তার কার্যসিদ্ধির চেষ্টা করে৷ এই যেমন সে তার মায়ের ব্যাগ খুলে ব্যাগ থেকে তার মায়ের মোবাইল ফোন নিতে যাচ্ছিলো, ওমনি আমি বিষয়টা দেখামাত্রই তাকে বললাম, "অন্যকে না বলে অন্যের জিনিস ধরাতো খারাপই, তার উপর তুমি মোবাইল ফোন ধরছো, এটাতো আরও খারাপ।" 

উত্তরে সে আমাকে বললো, "মায়ের মোবাইল ধরা সুন্নত।"

ঠিক এরকমই, 'চকলেট খাওয়া সুন্নত, দুপুরে ঘুমানো গুণাহ, রাতে ভাত না খেয়ে পিৎজা খাওয়া ফরয, ছোটো বাচ্চাদের মোবাইলে গেম খেলতে দেওয়া ফরয'; এরকম নিজের সুবিধামতন মনগড়া সুন্নত আর ফরয সে দিন দিন বানিয়েই চলেছে !  

এই বিষয়টা তার মধ্যে কেনো গড়ে উঠেছে ? 

কারণ তার আরবী শিক্ষক তাকে কোনোকিছু শেখানোর ক্ষেত্রেই বলেন, এমুক করা গুণাহ, তমুক করা সওয়াব। বেশি দুষ্টামি করলে বলেন, না পড়ে দুষ্টামি করা গুণাহ। এ কারণেই তার মনে হয়েছে এ জগতে সবকিছুই কেবল গুণাহ-সওয়াব আর পাপ-পুণ্যের দোহাই দিয়ে খুব সহজেই আদায় করা যায়।

বাস্তবিক, আমরা প্রায় সময়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে খারাপ কোনো বিষয় থেকে আমাদের শিশুদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করি। যেহেতু এই পন্থা সংক্ষিপ্ত আর সহজ, এজন্য বরাবরই আমরা এই পথটাকেই বেছে নেই। এটা করলে গুণাহ হবে, ওটা করলে পাপ হবে, সেটা করলে পুণ্য হবে; এতটুকুন শিক্ষা দিয়েই আমরা রীতিমতন হাত ধুয়ে ফেলি। 

এইতো সেদিন একটা সাত বছর বয়সী শিশুকে দেখছিলাম স্টিলের একটা গ্লাস বা এরকম কিছু একটা দিয়ে ফ্লোরে আঘাত করে খুব জোরে জোরে শব্দ করছিলো। শিশুটির মা এই বলে তাকে বারবার সতর্ক করছিলেন, এরকম বিচ্ছিরি শব্দ করো না আল্লাহ গুণাহ দিবেন। শিশুটি চারপাশে তাকালো, আবার শব্দ করতে লাগলো ! মা আবারও একই কথা বলে শিশুটিকে সতর্ক করলেন আর এরপরে পিঠে দুচার ঘা দিয়ে বসলেন। 

অথচ মা যদি একটু ধৈর্য্য ধারণ করে শিশুটিকে ঠিক এভাবে বুঝাতেন, বাসায় অন্য মানুষেরা আছে, তার অসুস্থ দীদা আছেন, সে এই শব্দ করাতে দীদার ঘুমুতে, বিশ্রাম নিতে কষ্ট হচ্ছে, আর এভাবে মানুষকে কষ্ট দিলে সৃষ্টিকর্তাও বিমুখ হতে পারেন। তবে নিশ্চয় শিশুটি বুঝতো, এবং এই শিক্ষা ভবিষ্যতে তাকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করতো। এই ছোট্ট একটা শিশু গুনাহ-সওয়াব কিংবা পাপ-পুণ্যের কি'ইবা বুঝবে, কতটুকুনই আর বুঝবে !  অথচ মা ধরেই নিয়েছেন পাপ-পুণ্যের ভয় কিংবা প্রলোভন দেখালেই তার অবুঝ সন্তানটি তার কথা শুনবেই ! 

এভাবেই অনেকটা আধেক আর একরকম ভ্রান্ত বিধিনিষেধের বেড়াজালে বেড়ে উঠে আমরা অনেকেই হয় অত্যন্ত অবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠি, কিংবা পরিণত বয়সে ভন্ড হয়ে উঠি। নিজেদের মনগড়া পাপ-পুণ্য আর গুণাহ-সওয়াবের তালিকা বানিয়ে সমাজ থেকে নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধাটুকুন আদায় করি, অন্যকে শোষণ ও দাবিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করি। যে ধর্মের সাথে মানবিকতা, ক্ষেত্রবিশেষে সত্যিকারের ধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্কই থাকে না !

Saturday, July 9, 2022

বাঙালি নারীর 'ব্যক্তি-অনধীনতা'

'ব্যক্তি স্বাধীনতা' আসলে কি ? 
আদতে এদেশে নারীদের 'ব্যক্তি স্বাধীনতা' আছে কি ? 
ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, চাকুরিতে যোগদান, অর্থ উপার্জন; এ সকল বিষয় একজন নারীর জীবনে আদৌ 'ব্যক্তি স্বাধীনতা' এনে দিতে পারে কি ? রাস্তায় যারা ইট ভাঙ্গছেন তাদের মাঝে এমন অনেক স্বাধীনচেতা নারীদের দেখা যায়, যাদের স্বামীদের কিংবা পরিবারের অতটুকুন সাহস হয় না স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর। 

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এমন অনেক নারীদের দেখা যায় যারা নিজের ও স্বামীর পরিবার কিংবা স্বামীর কথার বাহিরে খুঁটোটি নাড়বার সাহসটুকুনও রাখেন না ! ভারতীয় উপমহাদেশে আবহমান কাল জুড়ে থাকা সংস্কৃতি অনুযায়ী শিশু থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত নারীকে তার জীবনের প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারে পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় এবং তার কৃতকর্মের জন্য পরিবারের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। একইভাবে সেই নারী যদি কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোউন, তবে অনুরূপভাবে তার পরিণত জীবনাকালেও কোথাও যেতে হলে, কিছু করতে হলে তাকে কেবল তার স্বামীর কাছেই নয়, শ্বশুর-শ্বাশুড়িসহ পরিবারের প্রায় প্রত্যেকের সদস্যের কাছে 'অনুমতি প্রদানের আবেদনপত্র' দাখিল করতে হয়, সেই আবেদনপত্র আবার তাদের মন-মতি-মর্জি মতন মঞ্জুর হতে পারে, আবার খারিজও হতে পারে ! এভাবেই দেখা যাচ্ছে, একজন নারী শিশু থেকে যৌবনকালোবধি বাবা-মা তথা নিজের পরিবার, পরিণত বয়সে স্বামী ও সেই স্বামীর পরিবারের দ্বারা এবং শেষ বয়সে নিজ সন্তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোউন। 

অন্যদিকে; যদি কোনো নারী স্বেচ্ছায় কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হোউন, তারও কি শেষ রক্ষা মেলে জবাবদিহিতার ওমন খুঁতেল সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেওয়ার ? 'কেনো-কোথায়-কখন-কিভাবে-কেনো না-কি কারণে'; এই প্রশ্নগুলো প্রতি মুহূর্তে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় ! তাই বলা চলে; এদেশের বেশিরভাগ নারীরই জীবন কেটে যায় 'জবাবদিহিতা আর অনুমতি গ্রহণের' বেড়াজালে। 

নারীর ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার এই বিতিকিচ্ছিরি সংস্কৃতি বয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে সমাজ ও পরিবারের একটি 'অনুত্তম' উত্তর বা খোঁড়া যুক্তি হলো; নারীর নিরাপত্তা । 

দারুণতো ! 

বনের পাখিকে নিরাপত্তার খাতিরে আর যত্নের দোহাই দিয়ে খাঁচায় পুড়ে রাখাটা যদি কোনো জাতির নিকট যৌক্তিক হয়, তবে অনায়াসেই বলা চলে, হয় সে জাতি 'অস্বভাবী' কিংবা নেহাতই 'বৈড়ালব্রতী'। যদি সত্যিই কেউ বনের পাখির যত্ন নিতে চায় আর তার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে, তবে তার জন্যে অভয়ারণ্য তৈয়ার করা প্রয়োজন, যেখানে সে নিরাপদে কিন্তু নিজের মনের মতন বিচরণ করতে পারবে। 

কারো নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাকে কুক্ষিগত করার আভ্যন্তরীণ অর্থ হলো কেবলই তার ব্যক্তিত্ব আর  ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করা, একইসাথে তার ব্যক্তিগত জীবনে আধিপত্য বিস্তার করে নিজের ক্ষমতা জাহির করার মতন গর্হিত আচরণ প্রকাশ করা।  

তা সে যা বলছিলাম, ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, চাকুরিতে যোগদান, অর্থ উপার্জন; এসবকিছুর কোনোকিছুই কখনই একজন নারীর জীবনে তার 'ব্যক্তি স্বাধীনতা'কে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, যদি না নারী নিজ জীবনের সকল দায় ও দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে পারেন। সম্ভবত নিজ জীবনে ব্যক্তি স্বাধীনতার মতন মূল্যবান একটি সম্পদের বীজ বপনের প্রধান নিয়ামক এটিই। অর্থনৈতিক দায়িত্বতো অবশ্যম্ভাবী, তার সাথে আরেকটি আবশ্যিক বিষয় হলো নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করা। যেনো সেই দোহাই দিয়ে পরিবার কিংবা সমাজ একজন নারীর ব্যক্তিত্ব ও তার ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতাকে খর্ব ও কুক্ষিগত করতে না পারে   ।।

Sunday, July 3, 2022

ফিনিক্স পাখির জীবন

ছিপছিপে গড়নের শান্ত মেয়ে মোনালিসা আপা। আমার সাথে পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। একই এলাকায় থাকার সুবাদে যাওয়া আসার পথে টুকটাক হাই হ্যালো, ওই পর্যন্তই ছিলো। 

তবে তাকে যতবারই দেখেছি, তার হরিণের মতন মায়াবী চোখগুলো বরাবরই আমার নজর কেড়েছে। কি যেনো আছে তার চোখ জুড়ে, কেমন যেনো একটা মাদকতা, একবার তাকালে বারবার তাকাতে ইচ্ছে হয়, বহু সময়জুড়ে কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে হয়। 


একদিন তো আমি বলেই বসেছিলাম, আপা আমিতো আপনার দু'চোখের প্রেমে পরে যাচ্ছি। আপা হেসে দিলেন। সেদিনই প্রথম খেয়াল করলাম, হাসলে আপাকে দারুণ মিষ্টি দেখায়। গালে খুব হালকা করে টোল পরে যে ? সে কারণেই বোধহয়। 

এভাবে যাওয়া-আসার পথে টুকটাক কথা হতে হতেই আপার সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে।

আপার গায়ের রঙ ছিলো একটু চাপা, আর সে কারণেই যেনো আপাকে আরও বেশি মায়াবী দেখাতো। আর সে কারণেই হয়ত আপার জীবনে নেমে এসেছিলো ঘোর অনামিশা।

আপা পড়াশুনোয় তেমন একটা ভালো ছিলেন কিনা জানি না, তবে পড়তে তিনি মোটেও ভালোবাসতেন না, আর তার প্রমাণ আপার সব কথাতেই বেশ পাওয়া যেতো। বরাবরই তার ইচ্ছে ছিলো বিয়ে করে সংসারী হবেন। খুব গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন ছিলো আপার। তাই অনার্সে ভর্তি হতে না হতেই আপার সম্মতিতে তার পরিবারের লোকজন আপার বিয়ে ঠিক করেন। একরকম হুট করেই বলা চলে। 

অন্য আর আটদশটা দিনের মতনই আপার বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, অকস্মাৎ শুনতে পেলাম কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকছে।

ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মোনালিসা আপা ডাকছে। দু'সিঁড়ি করে ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে একদম শূন্যে ভেসে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছিলেন আপা, অনেকটা হরিণ শাবকের মতন ! 

এত্ত খুশি ? 

আর বলিস না, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার ! বলতো এত অল্প বয়সে বিয়ে করাটা কি ঠিক হচ্ছে ? 

বলেই লজ্জায় মুখ ঠেকে ফেললেন দু'হাত দিয়ে। 

বিতিব্যস্ত এবং অত্যন্ত বিরক্ত আমি বলেই বসলাম, তুমিইতো চেয়েছো বিয়ে করতে আপা, এখন আবার ওতো ন্যাকামি কেনো! 

যাহ !  তুইও, মুখে কিছু আটকায় না তোর। 

আজকে হলুদ, কাল বিশ্রাম, পরশু বিয়ে। আসিস কিন্তু, না আসলে আর কোনোদিন কথা বলবো না তোর সাথে। 

এই বলেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আপা আবারও সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠে গেলেন, এবার আপাকে লাগছিলো অনেকটা টোট্যাং এর মতন।



পারিবারিক একটা কারণে বেশ কিছুদিন আমাদের গ্রামের বাড়িতে থাকতে হয়েছিলো, তাই আপার বিয়েতে আর আমার আসা হয়ে ওঠেনি। এরপর যখন বাসায় ফিরলাম, আপাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিদিন মুখ তুলে চাইতাম, এই বুঝি আপা ডেকে উঠবেন, এই আশায় ! 

এরপর বছর গড়িয়ে যায়, আমিও আপার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। নিজের চিরাচরিত কাজ-কর্ম নিয়েই ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছি। 

হঠাৎ একদিন শুনলাম মা'কে পাশের বাসার আন্টি বলছেন, 'জানেন আপা, ওই বাসার মেয়েটাকে জামাইবাড়ি থেকে পিটায় হাসপাতালে পাঠায়ছে।' 

কে ? 

আরেহ হলুদ বাড়িটার, বাড়িওয়ালার মেয়েটা, মোনালিসা।

আমার বুকটা ধুক করে উঠলো। 

আন্টি এটা কি বললেন ! 

এত মিষ্টি একটা মেয়ে মোনালিসা আপা, কেনইবা তাকে মারধর করবে !  আপা তো আজীবন শুধু একটু গুছিয়ে সংসারই করতে চেয়েছেন। 

তবে কেনো....  ?

এই কেনোর উত্তর জানার জন্যে মাকে প্রশ্ন করার মতন সাহস আমার ছিলো না। 

অগত্যা আড়ি পাতাই ছিলো আপা সম্পর্কে জানার আমার একমাত্র উপায়।

আন্টি বলছিলেন, 'মেয়েটা কালো বলে ওরা অনেক পণ চেয়েছিলো, মোনালিসার বাবার তো টাকার অভাব নেই, তাদের চাওয়া সবই পূরণ করলো, কিন্তু ওদেরতো চাওয়াই শেষ হয় না !

এদিকে মোনালিসাকেও উঠতে-বসতে শুধু অপমান করতো । 

মোনালিসা আর সইলো না, একদিন প্রতিবাদ করে বসলো, অমনি ছেলে আর ছেলের মা ওর গায়ে হাত তুলে ফেললো। 

শুনলাম খাটের স্ট্যান্ড দিয়ে বেকায়দায় মারাতে মেয়েটার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। 

বাবা-ভাইয়েরা খুব চেষ্টা করছে মেয়েটাকে কোনোরকমে সুস্থ করে জামাইয়ের কাছে পাঠাতে। লোকে কি বলবে আপা বলেন ? 

আর মেয়েটা বলি বালাইষাট। 

মেয়েমানুষের অতো কথা বলতে আছে ? '

আমার মা কেবল বললেন, 'হুম।'

কি জানি তখন কি যেনো একটা ভাবছিলেন মা ! 

এরপর থেকেই দেখলাম আমার এবং তাঁর অন্যান্য মেয়েদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে মা আরও বেশি কঠোর হয়ে গেলেন।

তার কিছুদিন পরে আন্টির কাছ থেকেই জানতে পারলাম আপুর ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপু আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না, এমন কি মাও হতে পারবেন না; তাই আপুর স্বামী আপুকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। 

এদিকে আপুর পরিবারও খুব একটা আগ্রহী নয় আপুকে ফিরিয়ে নিতে, শুধুমাত্র আপুর মেঝো ভাইটি ছাড়া। 

এ অবস্থায় কোথায় যাবেন আপু ! 

মোনালিসা আপুর গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। শেষটা ঠিক কেমন হত ? 

আপু হুইল চেয়ারে বসে নিজের পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন অন্যের গলগ্রহ হয়ে আর গঞ্জনা শুনে ! আর একসময় কষ্ট সইতে না পেরে আপু বিষ খেয়ে মারা গেলেন। 

কেউ জানতে পারলো না এই আবদ্ধ শরীরটার ভেতরের প্রাঞ্জল আত্মাটার কথা ! 

আর আটদশজন মেয়ের জীবনে ঠিক এমনটা ঘটলেও মোনালিসা আপু এমন এক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন যা পাশের বাসার আন্টিকেও বাধ্য করলো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে। 

আন্টিতো এখন এলাকায় যাকেই পাচ্ছন বলে বেড়াচ্ছেন, 'কি করো তোমরা ?  মোনালিসার মত হতে পারো না ? কি জেদি মেয়েরে বাবা!' 

মেঝো ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে মোনালিসা আপা পড়াশুনাটা ঠিকঠাক সম্পন্ন করে নেন, একেবারে মাস্টার্স পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেন। সাথে নিজের হাতে করা রান্না নিয়ে একটা অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন, তার সাথে যোগ হয় হাতের কাজের বাহারি জামা-ব্যাগও। 

শুনেছি আপা এখন আর তার পরিবারের সাথে থাকেন না। নিজেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি। একইসাথে বেশক'জন এতিমের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে পুরোদস্তুর মা হয়ে উঠেছেন আপা।

ভাবছি, একদিন দেখতে যেতে হবে আপাকে। কি জানি কথা বলে কি না! 

যেই না জেদ আপার, সেই যে বললো, বিয়েতে না আসলে তোর সাথে কথা নেই; আজ কত বছর কেটে গেলো!  

আপা ঠিকই আপার কথা রাখলো ।।  

একাকিত্ব

সে আছে; তার হাসি আছে, অশ্রু টলমল জোড়া চোখ আছে, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস আছে, নৈসর্গিক ভালোবাসাও আছে । 


সে ছিল; তার অভিমান ছিল, সিক্ত চুলের ঘ্রাণ ছিল; যা আবিষ্ট করে রাখত এক ভয়ংকর মত্ততায় !

হঠাত্‍ সে নেই; 

তার চঞ্চল চরণের পদাঙ্ক নেই, 

মৃদু ছন্দ নেই, শ্বসন-নিশ্বসনের তপ্ত ব্যজন নেই,

আলিঙ্গনের উষ্ণতা নেই । 

কিন্তু তবুও সে আছে, তার সব আছে; 

কেবল তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। 

হাত বাড়ালেই সে মরীচিকা, সে কেবলই এক আকাশ দু:খ; 

সে হলো শুন্যতা । 

তার স্মৃতিরা হানা দেয় সময়-অসময়ে আর কাঁদায় অঝরে । 


সে নেই; কখনোই ছিল না। 

তার হাসি কেমন জানা নেই, 

তার স্বরের সুরটাও অজানা,

জানা নেই তার আবক্ষের গড়ন-অক্ষের শীতল দৃষ্টির প্রগাঢ়তা ; কিছুই জানা নেই । 

মাঝে মাঝেই কল্পনায় তার আবির্ভাব হয়, আবার চলেও যায় । তাকে ভাবতে ভালো লাগে,

কিন্তু তার জন্য কষ্ট হয়না কখনই; তার কোন স্মৃতি নেই ,

এটা একাকিত্ব ।


একাকিত্ব সহনীয় কিন্তু শুন্যতা অসহনীয়। 

যা অদেখা-অশ্রুত-অজানা; তা ভাবা যায়, ভাবতে ভালোও লাগে। 

অথচ যা একবার জানা হয়ে গেছে-পাওয়া হয়ে গেছে; তা হঠাত্‍ হারিয়ে গেলে সৃষ্টি হয় শুন্যতার, যার অনুভূতি সত্যিই ভীষণ ভয়ংকর । 


তাই প্রকৃতির কাছে চাওয়া; যা দাওনি, তা কখনো দিও না; 

আর যা দিয়েছো, তা কখনো ছিনিয়ে নিওনা  ।।

মায়ের মানসের অনাময

ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দ...