ছিপছিপে গড়নের শান্ত মেয়ে মোনালিসা আপা। আমার সাথে পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। একই এলাকায় থাকার সুবাদে যাওয়া আসার পথে টুকটাক হাই হ্যালো, ওই পর্যন্তই ছিলো।
তবে তাকে যতবারই দেখেছি, তার হরিণের মতন মায়াবী চোখগুলো বরাবরই আমার নজর কেড়েছে। কি যেনো আছে তার চোখ জুড়ে, কেমন যেনো একটা মাদকতা, একবার তাকালে বারবার তাকাতে ইচ্ছে হয়, বহু সময়জুড়ে কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে হয়।
একদিন তো আমি বলেই বসেছিলাম, আপা আমিতো আপনার দু'চোখের প্রেমে পরে যাচ্ছি। আপা হেসে দিলেন। সেদিনই প্রথম খেয়াল করলাম, হাসলে আপাকে দারুণ মিষ্টি দেখায়। গালে খুব হালকা করে টোল পরে যে ? সে কারণেই বোধহয়।
এভাবে যাওয়া-আসার পথে টুকটাক কথা হতে হতেই আপার সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে।
আপার গায়ের রঙ ছিলো একটু চাপা, আর সে কারণেই যেনো আপাকে আরও বেশি মায়াবী দেখাতো। আর সে কারণেই হয়ত আপার জীবনে নেমে এসেছিলো ঘোর অনামিশা।
আপা পড়াশুনোয় তেমন একটা ভালো ছিলেন কিনা জানি না, তবে পড়তে তিনি মোটেও ভালোবাসতেন না, আর তার প্রমাণ আপার সব কথাতেই বেশ পাওয়া যেতো। বরাবরই তার ইচ্ছে ছিলো বিয়ে করে সংসারী হবেন। খুব গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন ছিলো আপার। তাই অনার্সে ভর্তি হতে না হতেই আপার সম্মতিতে তার পরিবারের লোকজন আপার বিয়ে ঠিক করেন। একরকম হুট করেই বলা চলে।
অন্য আর আটদশটা দিনের মতনই আপার বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, অকস্মাৎ শুনতে পেলাম কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকছে।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মোনালিসা আপা ডাকছে। দু'সিঁড়ি করে ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে একদম শূন্যে ভেসে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছিলেন আপা, অনেকটা হরিণ শাবকের মতন !
এত্ত খুশি ?
আর বলিস না, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার ! বলতো এত অল্প বয়সে বিয়ে করাটা কি ঠিক হচ্ছে ?
বলেই লজ্জায় মুখ ঠেকে ফেললেন দু'হাত দিয়ে।
বিতিব্যস্ত এবং অত্যন্ত বিরক্ত আমি বলেই বসলাম, তুমিইতো চেয়েছো বিয়ে করতে আপা, এখন আবার ওতো ন্যাকামি কেনো!
যাহ ! তুইও, মুখে কিছু আটকায় না তোর।
আজকে হলুদ, কাল বিশ্রাম, পরশু বিয়ে। আসিস কিন্তু, না আসলে আর কোনোদিন কথা বলবো না তোর সাথে।
এই বলেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আপা আবারও সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠে গেলেন, এবার আপাকে লাগছিলো অনেকটা টোট্যাং এর মতন।
পারিবারিক একটা কারণে বেশ কিছুদিন আমাদের গ্রামের বাড়িতে থাকতে হয়েছিলো, তাই আপার বিয়েতে আর আমার আসা হয়ে ওঠেনি। এরপর যখন বাসায় ফিরলাম, আপাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিদিন মুখ তুলে চাইতাম, এই বুঝি আপা ডেকে উঠবেন, এই আশায় !
এরপর বছর গড়িয়ে যায়, আমিও আপার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। নিজের চিরাচরিত কাজ-কর্ম নিয়েই ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছি।
হঠাৎ একদিন শুনলাম মা'কে পাশের বাসার আন্টি বলছেন, 'জানেন আপা, ওই বাসার মেয়েটাকে জামাইবাড়ি থেকে পিটায় হাসপাতালে পাঠায়ছে।'
কে ?
আরেহ হলুদ বাড়িটার, বাড়িওয়ালার মেয়েটা, মোনালিসা।
আমার বুকটা ধুক করে উঠলো।
আন্টি এটা কি বললেন !
এত মিষ্টি একটা মেয়ে মোনালিসা আপা, কেনইবা তাকে মারধর করবে ! আপা তো আজীবন শুধু একটু গুছিয়ে সংসারই করতে চেয়েছেন।
তবে কেনো.... ?
এই কেনোর উত্তর জানার জন্যে মাকে প্রশ্ন করার মতন সাহস আমার ছিলো না।
অগত্যা আড়ি পাতাই ছিলো আপা সম্পর্কে জানার আমার একমাত্র উপায়।
আন্টি বলছিলেন, 'মেয়েটা কালো বলে ওরা অনেক পণ চেয়েছিলো, মোনালিসার বাবার তো টাকার অভাব নেই, তাদের চাওয়া সবই পূরণ করলো, কিন্তু ওদেরতো চাওয়াই শেষ হয় না !
এদিকে মোনালিসাকেও উঠতে-বসতে শুধু অপমান করতো ।
মোনালিসা আর সইলো না, একদিন প্রতিবাদ করে বসলো, অমনি ছেলে আর ছেলের মা ওর গায়ে হাত তুলে ফেললো।
শুনলাম খাটের স্ট্যান্ড দিয়ে বেকায়দায় মারাতে মেয়েটার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে।
বাবা-ভাইয়েরা খুব চেষ্টা করছে মেয়েটাকে কোনোরকমে সুস্থ করে জামাইয়ের কাছে পাঠাতে। লোকে কি বলবে আপা বলেন ?
আর মেয়েটা বলি বালাইষাট।
মেয়েমানুষের অতো কথা বলতে আছে ? '
আমার মা কেবল বললেন, 'হুম।'
কি জানি তখন কি যেনো একটা ভাবছিলেন মা !
এরপর থেকেই দেখলাম আমার এবং তাঁর অন্যান্য মেয়েদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে মা আরও বেশি কঠোর হয়ে গেলেন।
তার কিছুদিন পরে আন্টির কাছ থেকেই জানতে পারলাম আপুর ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপু আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না, এমন কি মাও হতে পারবেন না; তাই আপুর স্বামী আপুকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে।
এদিকে আপুর পরিবারও খুব একটা আগ্রহী নয় আপুকে ফিরিয়ে নিতে, শুধুমাত্র আপুর মেঝো ভাইটি ছাড়া।
এ অবস্থায় কোথায় যাবেন আপু !
মোনালিসা আপুর গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। শেষটা ঠিক কেমন হত ?
আপু হুইল চেয়ারে বসে নিজের পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন অন্যের গলগ্রহ হয়ে আর গঞ্জনা শুনে ! আর একসময় কষ্ট সইতে না পেরে আপু বিষ খেয়ে মারা গেলেন।
কেউ জানতে পারলো না এই আবদ্ধ শরীরটার ভেতরের প্রাঞ্জল আত্মাটার কথা !
আর আটদশজন মেয়ের জীবনে ঠিক এমনটা ঘটলেও মোনালিসা আপু এমন এক কান্ড ঘটিয়ে বসলেন যা পাশের বাসার আন্টিকেও বাধ্য করলো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে।
আন্টিতো এখন এলাকায় যাকেই পাচ্ছন বলে বেড়াচ্ছেন, 'কি করো তোমরা ? মোনালিসার মত হতে পারো না ? কি জেদি মেয়েরে বাবা!'
মেঝো ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে মোনালিসা আপা পড়াশুনাটা ঠিকঠাক সম্পন্ন করে নেন, একেবারে মাস্টার্স পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেন। সাথে নিজের হাতে করা রান্না নিয়ে একটা অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন, তার সাথে যোগ হয় হাতের কাজের বাহারি জামা-ব্যাগও।
শুনেছি আপা এখন আর তার পরিবারের সাথে থাকেন না। নিজেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি। একইসাথে বেশক'জন এতিমের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে পুরোদস্তুর মা হয়ে উঠেছেন আপা।
ভাবছি, একদিন দেখতে যেতে হবে আপাকে। কি জানি কথা বলে কি না!
যেই না জেদ আপার, সেই যে বললো, বিয়েতে না আসলে তোর সাথে কথা নেই; আজ কত বছর কেটে গেলো!
আপা ঠিকই আপার কথা রাখলো ।।